সাতক্ষীরার কালিগঞ্জে পাড়া-মহল্লায় মাদকের রমরমা কারবার: বিপথগামী তরুণ সমাজ, আতঙ্কে স্থানীয়রা

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

সীমান্তবর্তী জেলা সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ উপজেলার গ্রাম-গঞ্জে গাঁজা, দেশি-বিদেশি মদ ও ফেনসিডিলসহ নানা মাদকের বিস্তার আশঙ্কাজনক রূপ নিয়েছে। উপজেলার ১২টি ইউনিয়নের অলিগলি থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত জনপদে মাদক সেবন ও কেনাবেচার একাধিক চক্র গড়ে উঠেছে। বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ সড়কের মোড়ে গড়ে ওঠা চায়ের ও মুদির দোকান এখন মাদক চক্রের প্রধান আখড়ায় পরিণত হয়েছে। সন্ধ্যার পর থেকেই এসব দোকানে বখাটেদের ভিড় জমে। ক্যারম বোর্ড বা তাস খেলার আড়ালে চলে গাঁজা ও অন্যান্য নেশাজাতীয় দ্রব্যের রমরমা কারবার, যা গভীর রাত পর্যন্ত চলতে থাকে। এতে এলাকার সামাজিক পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে এবং স্থানীয় তরুণ প্রজন্ম দ্রুত বিপথে পা বাড়াচ্ছে।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, চায়ের দোকানে মাদক কেনাবেচা দিনদিন বাড়লেও ভয়ে কেউ মুখ খোলার সাহস পান না। অন্যায়ের প্রতিবাদ করলে রাতেই নেমে আসে প্রতিশোধের খড়্গ। রাতের আঁধারে প্রতিবাদকারীদের বাড়ির নারকেল গাছ থেকে ডাব কেটে নেওয়া, কলাগাছ সাবাড় করা কিংবা সুপারি চুরির ঘটনা ঘটছে। এমনকি পুকুরের মাছ বিষ দিয়ে মারা, হাঁস-মুরগি চুরি কিংবা ফলদ ও বনজ চারা গাছ কেটে ফেলার মতো ঘটনাও অহরহ ঘটছে। সাধারণ মানুষ এই মাদকাসক্তদের কারণে দিনরাত চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। মাদকের টাকা জোগাড় করতে উঠতি বয়সের বখাটেরা এলাকায় চুরি-ছিনতাই বাড়িয়েছে। দিনে কোনো জিনিস বাইরে রাখলে সকালে আর তার হদিস পাওয়া যায় না।

কালিগঞ্জ উপজেলার ৮ নম্বর ভাড়াশিমলা ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের সাতবসু গ্রামে মাদকের এমন চিত্র স্পষ্টভাবে চোখে পড়ে। স্থানীয়দের অভিযোগ, সাতবসু গ্রামের মিন্টু বাবুর বাড়ির পেছনের রাস্তার মোড়ে রফিকুল ইসলাম ওরফে বেজী মান্নার চায়ের দোকানে নিয়মিত বখাটেদের আনাগোনা থাকে। সেখানে প্রকাশ্যেই মাদক বেচাকেনা ও সেবন চলে। এমনকি স্থানীয় নারকেল গাছের পাতা ছিঁড়ে তার ভেতরে গাঁজা ভরে বিড়ির মতো পাকিয়ে সেবন করে তারা। নেশার অর্থ সংগ্রহ করতে এলাকার মানুষের বিভিন্ন জিনিসপত্র চুরির ঘটনা এখন এই এলাকায় নিত্যদিনের বিষয়ে পরিণত হয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে মাদক কারবারিরা নেটওয়ার্ক গ্রাম পর্যন্ত বিস্তৃত করেছে। প্রাপ্ত তথ্যে জানা গেছে, কালিগঞ্জ সার্কেলের কালিগঞ্জ, আশাশুনি, দেবহাটা ও শ্যামনগর এই চার উপজেলায় মাদক ব্যবসা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করছে তালিকাভুক্ত প্রায় ২০০ জন শীর্ষ মাদক কারবারি। তারা সীমান্ত দিয়ে বিপুল অঙ্কের মাদক দেশে ঢুকিয়ে প্রত্যন্ত এলাকায় এজেন্টদের মাধ্যমে ছড়িয়ে দিচ্ছে। মাদক বিক্রির এই কালো বাজারে প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার লেনদেন হচ্ছে, যা আন্তর্জাতিক অঙ্কে কয়েক লাখ ডলারের ($) সমান। ফলে মাদক ব্যবসায়ীরা বিত্তশালী হলেও নিঃস্ব হচ্ছে সাধারণ পরিবারগুলো।

এক গবেষণায় দেশে মাদক পরিস্থিতির ভয়াবহ এক চিত্র ফুটে উঠেছে। তথ্যানুযায়ী, দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪.৮৮% মানুষ কোনো না কোনো মাদক সেবন করেন। মাদকসেবীদের তালিকায় ইয়াবা, অ্যালকোহল, কফ সিরাপ ও হেরোইন থাকলেও সবচেয়ে শীর্ষে রয়েছে গাঁজা। সবচেয়ে আতঙ্কের বিষয় হলো, নতুন প্রজন্ম অতি অল্প বয়সেই এতে জড়িয়ে পড়ছে। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় ৩৩% মাদকসেবী প্রথম নেশা গ্রহণ শুরু করেন ৮ থেকে ১৭ বছর বয়সে। আর ৫৯% সেবীর ক্ষেত্রে এই নেশা শুরুর বয়স ১৮ থেকে ২৫ বছরের মধ্যে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কর্মসংস্থানের অভাব, বেকারত্ব, পারিবারিক অশান্তি ও হতাশা তরুণদের মাদকের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। তবে বড় কারণ হলো হাতের নাগালে মাদক পাওয়া। গবেষণায় অংশ নেওয়া মাদকসেবীদের প্রায় ৯০% জানিয়েছেন, তাদের কাছে মাদক পাওয়া খুবই সহজ। পাড়ার মোড়ে মাদক সহজলভ্য হওয়ায় কৌতূহলবশত শুরু করা তরুণরাও ধীরে ধীরে নিয়মিত সেবী হয়ে উঠছে। পারিবারিক শান্তি বিনষ্ট হওয়ার পাশাপাশি সমাজে বাড়ছে বিশৃঙ্খলা ও নানা অপরাধ।

কালিগঞ্জের সচেতন নাগরিক ও শিক্ষানুরাগী মহল মনে করেন, যুবসমাজকে বাঁচাতে এখনই মাদকের বিস্তার রুখতে হবে। শুধু খুচরা সেবীদের আটক না করে ২০০ শীর্ষ মাদক কারবারির বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। এ জন্য পুলিশ, ডিবি ও বিজিবির সমন্বয়ে যৌথ সাঁড়াশি অভিযান চালানো জরুরি। পাড়ার সন্দেহভাজন চায়ের দোকানগুলোতে নিয়মিত নজরদারি না বাড়ালে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যাবে। স্থানীয় সচেতন মহল প্রশাসনের কাছে অবিলম্বে দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়ার জোর দাবি জানিয়েছেন।

সম্পর্কিত নিবন্ধ