মাদকমুক্ত সমাজ গড়ার প্রত্যয়ে ঝিনাইদহের শৈলকুপায় দিন ও রাত্রিকালীন বিশেষ অভিযান চালিয়ে এক মাদকসেবীকে হাতেনাতে গ্রেপ্তার করেছে থানা পুলিশ। শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) পরিচালিত এই বিশেষ অভিযানে গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তির নাম মো. শফিকুল ইসলাম (৩০)। গ্রেপ্তারের পরপরই পুলিশ তাঁকে আদালতে সোপর্দ করলে বিজ্ঞ আদালত তাঁকে চার মাসের সশ্রম কারাদণ্ড এবং এক হাজার টাকা অর্থদণ্ড দেন। জরিমানা অনাদায়ে তাঁকে আরও ১০ দিন কারাভোগ করতে হবে বলে রায়ে উল্লেখ করা হয়। পুলিশের এ ধরনের তাৎক্ষণিক পদক্ষেপে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় এলাকাবাসী।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, মাদক ও নানাবিধ অপরাধ নির্মূল করতে শৈলকুপা থানা পুলিশের একটি চৌকস দল শুক্রবার দিনব্যাপী উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনা করে। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে পুলিশ জানতে পারে, পদমদী এলাকায় প্রকাশ্যে মাদক সেবন ও কেনাবেচা চলছে। এমন খবরের ভিত্তিতে পুলিশ দল দ্রুত ওই স্থানে অভিযান চালায়। সেখান থেকে মাদক গ্রহণরত অবস্থায় পদমদী গ্রামের মো. আনারুল হক ও মোছা. বুলু খাতুনের ছেলে শফিকুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। অভিযানে তাঁর কাছ থেকে মাদকদ্রব্য সেবনের বিভিন্ন সরঞ্জাম জব্দ করা হয়।
আটকের পর প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া শেষে পুলিশ শফিকুলকে আদালতে হাজির করে। সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞ আদালত সাক্ষ্য-প্রমাণ ও পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে দ্রুত এই রায় ঘোষণা করেন। বিচারক আসামিকে চার মাসের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়ার পাশাপাশি নগদ ১,০০০ টাকা অর্থদণ্ডের আদেশ দেন। অর্থদণ্ডের টাকা পরিশোধে ব্যর্থ হলে অতিরিক্ত ১০ দিন বিনাশ্রম কারাদণ্ডের আদেশ কার্যকরের নির্দেশ দেন আদালত। রায় ঘোষণার পরই কঠোর পুলিশি পাহারায় দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিকে ঝিনাইদহ জেলা কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
শৈলকুপা ও এর আশপাশের এলাকায় সাম্প্রতিক সময়ে মাদকসেবীদের আনাগোনা সাধারণ মানুষের মধ্যে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে দেশে অবৈধ মাদক ঢুকছে, যা আন্তর্জাতিক বাজারে শত শত ডলার ($)-এর সমান মূল্যে লেনদেন হয়। এই অবৈধ ব্যবসার কারণে গ্রামীণ জনপদে তরুণ ও যুবসমাজের প্রায় ৭০% থেকে ৮০% নৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। বিশেষ করে পারিবারিকভাবে নিঃস্ব হচ্ছে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ। যুবসমাজকে রক্ষা করতে কেবল সেবনকারী নয়, বরং মূল মাদক কারবারিদের শিকড় উপড়ে ফেলার দাবি দীর্ঘদিনের।
অভিযান প্রসঙ্গে শৈলকুপা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. হুমায়ূন কবির মোল্লা বলেন, ঝিনাইদহ জেলাকে সম্পূর্ণ মাদক ও অপরাধমুক্ত করতে পুলিশ প্রশাসন জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে। শৈলকুপা থানায় অপরাধীদের কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে উল্লেখ করেন, মাদক কারবারি ও মাদকসেবীদের সমূলে নির্মূল করতে শৈলকুপা থানা পুলিশের দিন ও রাত্রিকালীন এই সাঁড়াশি অভিযান শতভাগ (১০০%) অব্যাহত থাকবে। কোনো প্রভাবশালী মহলের সুপারিশ বা রক্তচক্ষু পুলিশকে এই দায়িত্ব পালন থেকে বিরত রাখতে পারবে না।
ওসি আরও জানান, যুবসমাজকে মাদকের মরণফাঁদ থেকে বাঁচাতে কেবল পুলিশি অভিযানই যথেষ্ট নয়, পরিবার ও সমাজের দায়িত্বশীল মানুষদেরও এগিয়ে আসতে হবে। সন্তানরা কোথায় যায়, কার সঙ্গে সময় কাটায়—এ বিষয়ে অভিভাবকদের নিবিড় নজরদারি রাখতে হবে। এছাড়া গ্রামের প্রতিটি পাড়া-মহল্লায় মাদকবিরোধী সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। কোথাও কোনো মাদক বেচাকেনা বা আসরের খবর পেলে তাৎক্ষণিকভাবে পুলিশকে জানানোর অনুরোধ করেন তিনি। তথ্যদাতার পরিচয় পুরোপুরি গোপন রাখা হবে বলেও আশ্বস্ত করেন এই পুলিশ কর্মকর্তা।
এদিকে পুলিশের এমন কঠোর অভিযানে স্বস্তি প্রকাশ করেছেন শৈলকুপার সাধারণ নাগরিক ও অভিভাবক মহল। তাঁরা বলছেন, মাদকাসক্তির কারণে এলাকায় চুরি, ছিনতাই ও পারিবারিক অশান্তি মারাত্মকভাবে বেড়ে গিয়েছিল। নিয়মিত অভিযানের মাধ্যমে মাদকসেবীদের আইনের আওতায় আনা হলে অপরাধপ্রবণতা অনেকটাই কমে আসবে। সচেতন নাগরিকরা চান, শৈলকুপা থানা পুলিশ যেন কোনো চাপের কাছে নতি স্বীকার না করে এ ধরনের বিশেষ অভিযান নিয়মিতভাবে অব্যাহত রাখে।
শৈলকুপা থানা পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, মাদক নির্মূলের এই ধারাবাহিক লড়াইয়ে কোনো বিরতি থাকবে না। শহরের অলিগলি থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যন্ত পুলিশের নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। রাতের পাশাপাশি দিনেও সাদা পোশাকে দায়িত্ব পালন করছে একাধিক দল। ঝিনাইদহ জেলাকে মাদক ও অপরাধমুক্ত একটি আদর্শ অঞ্চলে রূপান্তর করতে পুলিশ বাহিনী বদ্ধপরিকর এবং এই লক্ষ্যে সাধারণ জনগণের আন্তরিক সহযোগিতাই তাদের সবচেয়ে বড় শক্তি।
















