ডোনাল্ডের চোখে বদলে যাওয়া অস্ট্রেলিয়া: বাংলাদেশের কাছে হারেই স্পষ্ট ব্যাটিং সংকট

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

ক্রিকেট বিশ্বে একসময় অস্ট্রেলিয়া দলের মুখোমুখি হওয়া মানেই ছিল প্রতিপক্ষের জন্য নিশ্চিত ভীতি। স্টিভ ওয়াহ কিংবা রিকি পন্টিংয়ের নেতৃত্বাধীন সেই সোনালী প্রজন্মে অস্ট্রেলিয়া ম্যাচ শুরু করার আগেই যেন অর্ধেক মনস্তাত্ত্বিক লড়াই জিতে নিত। তবে সেই অপরাজেয় অস্ট্রেলিয়া এখন অতীত। দক্ষিণ আফ্রিকার কিংবদন্তি পেসার ও বাংলাদেশ দলের সাবেক বোলিং কোচ অ্যালান ডোনাল্ড স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন, বর্তমান অস্ট্রেলিয়া দল তাদের সেই পুরোনো দাপট সম্পূর্ণ হারিয়ে ফেলেছে। সামনে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে অস্ট্রেলিয়ার তিন ম্যাচের কঠিন টেস্ট সিরিজ। তার আগেই অজিদের ব্যাটিং দুর্বলতা নিয়ে তীব্র প্রশ্ন তুললেন ডোনাল্ড।

ক্রীড়া বিষয়ক সংবাদমাধ্যম স্পোর্টসবুমকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে ডোনাল্ড স্মৃতিচারণ করে বলেন, ২০০০ সালের শুরুতে অস্ট্রেলিয়া দলের নাম শুনলেই প্রতিপক্ষ শিবির থমকে যেত। সে সময় তাদের দলে ছিলেন শেন ওয়ার্ন, গ্লেন ম্যাকগ্রা, জেসন গিলেস্পি আর ব্রেট লির মতো ভয়ংকর সব বোলার। আর ব্যাটিংয়ে ম্যাথু হেইডেন, অ্যাডাম গিলক্রিস্টদের মতো মহাতারকাদের নিয়ে গড়া লাইনআপ ছিল অবিশ্বাস্য। স্টিভ ওয়াহ নিখুঁতভাবে যে দলটি তৈরি করেছিলেন, পরে রিকি পন্টিং সেই দলের নেতৃত্ব নিয়ে অস্ট্রেলিয়াকে অনন্য উচ্চতায় তোলেন। ডোনাল্ডের মতে, এখনকার অস্ট্রেলিয়া দলে সেই দাপটের ছিটেফোঁটাও অবশিষ্ট নেই।

অস্ট্রেলিয়ার চলমান দুর্দশা বোঝাতে গিয়ে অ্যালান ডোনাল্ড সম্প্রতি শেষ হওয়া বাংলাদেশ সিরিজের উদাহরণ টেনেছেন। ডারউইনে প্রথম টেস্টে অস্ট্রেলিয়াকে রীতিমতো চমকে দিয়ে ৯ উইকেটের বিশাল ব্যবধানে জয় ছিনিয়ে নেয় টাইগাররা। ওই ম্যাচে প্রথম ইনিংসে অজিরা মাত্র ১৯৮ রানে অলআউট হয়ে যায়। জবাবে বাংলাদেশ ৪২৬ রানের পাহাড় গড়ে ম্যাচের পুরো নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে তুলে নেয়। যদিও সিরিজের দ্বিতীয় টেস্টে ম্যাকাইয়ে অজিরা ঘুরে দাঁড়িয়ে ইনিংস ও ৫১ রানে ম্যাচ জেতে এবং সিরিজ ১-১ সমতায় শেষ করে। তবে ডোনাল্ড মনে করেন, দ্বিতীয় ম্যাচের সেই জয় দিয়েও দলের মৌলিক দুর্বলতা কোনোভাবেই আড়াল করা যাবে না।

ডোনাল্ডের দাবি, ডারউইনে বাংলাদেশের কাছে অজিদের এমন নাস্তানাবুদ হওয়া তাদের ব্যাটিং লাইনের দীর্ঘদিনের ব্যর্থতার প্রমাণ। শতকরা হিসেবে অন্তত ৭০% ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, দলের টপ অর্ডার ব্যাটাররা উইকেটে পর্যাপ্ত সময় কাটাতে ব্যর্থ হচ্ছেন। ব্যাটিং ব্যর্থতার কারণে প্রায় ১০০% বাড়তি চাপ গিয়ে পড়ছে বোলারদের ওপর। ফিল্ডিং ও বোলিং করে আসার পর বোলারদের শ্বাস নেওয়ার সুযোগও দিচ্ছেন না ব্যাটাররা। দ্রুত উইকেট হারানোর ফলে বোলারদের বারবার নতুন স্পেলে বল হাতে নামতে হচ্ছে। দলের ড্রেসিংরুমে এখন ব্যাটার বনাম বোলারদের পারফরম্যান্স নিয়ে এক ধরনের অদৃশ্য সংকট তৈরি হয়েছে।

ব্যাটিং নিয়ে কড়া সমালোচনা করলেও প্যাট কামিন্স, মিচেল স্টার্ক ও জশ হ্যাজলউডের বোলিং আক্রমণকে এখনো বিশ্বের অন্যতম সেরা হিসেবে মানছেন ডোনাল্ড। বৈশ্বিক ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগ ও কেন্দ্রীয় চুক্তি মিলিয়ে এরা প্রত্যেকেই প্রতি বছর লাখ লাখ $ ডলার উপার্জন করেন এবং মাঠের পারফরম্যান্সেও নিজেদের প্রমাণ করে চলেছেন। তবে ডোনাল্ডের যুক্তি, শুধু বিশ্বমানের পেস আক্রমণ দিয়ে টেস্ট ম্যাচ জেতা যায় না। যদি স্কোরবোর্ডে ব্যাটাররা পর্যাপ্ত রান তুলে না দিতে পারেন, তবে কামিন্স কিংবা স্টার্কের মতো বিশ্বমানের বোলারদের সামর্থ্যও দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে ব্যর্থ হতে পারে।

বাংলাদেশ দলের সাবেক কোচ হিসেবে দীর্ঘদিন কাজ করায় টাইগারদের মানসিকতা বেশ ভালোভাবেই জানা ডোনাল্ডের। তিনি আনন্দের সঙ্গে উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা শতভাগ একাগ্রতা নিয়ে মাঠে নামলে অস্ট্রেলিয়াকে তাদের ঘরের মাঠেই হারানো সম্ভব, যা ডারউইনে করে দেখিয়েছে লাল-সবুজ জার্সিধারীরা। কিন্তু এই হারের ফলে অস্ট্রেলিয়ান সমর্থকদের মধ্যে এক ধরনের গভীর হতাশা তৈরি হয়েছে। নিয়মিত এমন বিপর্যয়ের মুখে পড়লে বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে ওঠা অস্ট্রেলিয়ার জন্য অত্যন্ত কঠিন হয়ে দাঁড়াবে।

সব মিলিয়ে আগামী ৯ অক্টোবর থেকে ডারবানে শুরু হতে যাওয়া তিন টেস্টের সিরিজে অস্ট্রেলিয়াকে বড় পরীক্ষার মুখে পড়তে হবে বলে সতর্ক করেছেন ডোনাল্ড। নিজের দেশের মাটিতে গতি ও বাউন্সের উইকেটে দক্ষিণ আফ্রিকার বোলাররা অজিদের ব্যাটিং দুর্বলতাকে পুরোদমে উন্মোচিত করে দিতে পারে। অস্ট্রেলিয়া যতই দাবি করুক তারা দ্রুত ঘুরে দাঁড়াবে, বাস্তবে তাদের সামনে এখন খাদের কিনারে দাঁড়িয়ে লড়ার মতো কঠিন চ্যালেঞ্জ। এখন দেখার বিষয়, প্রোটিয়াদের ডেরায় কামিন্সের দল পুরোনো গৌরব ফেরাতে পারে, নাকি সংকটের পরিধি আরও বাড়ায়।

সম্পর্কিত নিবন্ধ