দেশের কওমি ও আলিয়াসহ বিভিন্ন আবাসিক ও অনাবাসিক মাদ্রাসায় শিক্ষার্থীদের ওপর ধারাবাহিক যৌন নির্যাতন, ধর্ষণ ও অমানবিক শারীরিক নির্যাতন বন্ধে সরকারকে কড়া আইনি নোটিশ দেওয়া হয়েছে। সোমবার রেজিস্ট্রি ডাকযোগে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মুহাম্মদ নূরুল হুদা সরকারের গুরুত্বপূর্ণ চার সচিবের কাছে এই নোটিশ পাঠান। নোটিশ পাওয়ার ৭ কার্যদিবসের মধ্যে মাদ্রাসার শিশুদের সুরক্ষায় দৃশ্যমান ও কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে বিষয়টি নিয়ে হাইকোর্টে রিট আবেদন দায়ের করার চূড়ান্ত হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। নোটিশপ্রাপ্তরা হলেন স্বরাষ্ট্রসচিব, শিক্ষাসচিব, আইনসচিব এবং ধর্মসচিব।
আইনি নোটিশে উল্লেখ করা হয়, ধর্মীয় শিক্ষার পবিত্র পরিবেশের ওপর আস্থা রেখে লাখ লাখ অভিভাবক তাদের সন্তানদের মাদ্রাসায় ভর্তি করান। কিন্তু সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মাদ্রাসায় শিশু শিক্ষার্থীদের ওপর বর্বরোচিত যৌন নিপীড়ন ও পাশবিক নির্যাতনের খবর গণমাধ্যমে আসছে। অনেক ক্ষেত্রে প্রভাবশালী শিক্ষক বা স্থানীয় পরিচালনা কমিটির ভয়ে প্রায় ৮০% ঘটনাই লোকচক্ষুর আড়ালে ধামাচাপা পড়ে যায়। দরিদ্র পরিবারের অভিভাবকরা লোকলজ্জা ও হুমকির মুখে আইনের আশ্রয় নিতে সাহস পান না। ফলে শিশুরা কেবল শারীরিক ক্ষতির শিকারই হচ্ছে না, বরং সারাজীবনের জন্য গভীর মানসিক ট্রমার মধ্যে পড়ে যাচ্ছে।
নোটিশে আইনজীবী নূরুল হুদা জানান, দেশের প্রায় ২০ হাজারের বেশি আবাসিক মাদ্রাসায় লাখ লাখ শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। তবে অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, এসব প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৭০% থেকে ৭৫% ক্ষেত্রে সরকারের কোনো কার্যকর তদারকি বা নজরদারি ব্যবস্থা নেই। প্রশাসনিক নজরদারির চরম ঘাটতির সুযোগে কিছু চরিত্রহীন শিক্ষক ও তত্ত্বাবধায়ক শিশুদের ওপর দিনের পর দিন পাশবিক নির্যাতন চালায়। অনেক ক্ষেত্রে শারীরিক আঘাত ও মানসিক ট্রমা এতটাই প্রকট হয় যে, শিশুদের চিকিৎসার পেছনে পরিবারকে হাজার হাজার টাকা বা প্রায় $২০০ থেকে $৩০০ ডলার খরচ করতে হয়। নির্যাতনের মাত্রা সইতে না পেরে অনেকে আত্মহত্যার পথও বেছে নেয়।
শিশুদের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিতে নোটিশে বেশ কয়েকটি বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নেওয়ার তাগিদ দেওয়া হয়। এর মধ্যে রয়েছে আবাসিক মাদ্রাসার প্রবেশমুখ ও করিডোরে শতভাগ (১০০%) সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন। শিক্ষক নিয়োগের আগে পুলিশের মাধ্যমে প্রত্যেকের চারিত্রিক অতীত যাচাই করা আবশ্যক। এছাড়া নির্যাতিত শিক্ষার্থীরা যেন গোপনে অভিযোগ জানাতে পারে, সেজন্য প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে অভিযোগ বাক্স বসাতে হবে। পাশাপাশি জাতীয় জরুরি হেল্পলাইন ৯৯৯ এবং শিশু সহায়তার ১০৯৮ নম্বরের মতো টোল-ফ্রি সেবাগুলোর প্রচার বাড়ানো দরকার, যাতে বিনা খরচে নির্যাতিত শিশুরা তাৎক্ষণিক সরকারি সহায়তা পায়।
সংবিধানের ২৭, ২৮, ৩১ ও ৩২ অনুচ্ছেদ তুলে ধরে নোটিশে বলা হয়, রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিকের আইনের সমান আশ্রয় লাভ এবং সুরক্ষার অধিকার রয়েছে। এছাড়া ২০১৩ সালের শিশু আইন অনুযায়ী শিশুদের যেকোনো শারীরিক ও যৌন নির্যাতন জামিন-অযোগ্য এবং কঠোর শাস্তিযোগ্য অপরাধ। মহামান্য সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ ইতিপূর্বে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শারীরিক ও মানসিক শাস্তি পুরোপুরি নিষিদ্ধ করে ঐতিহাসিক রায় দিয়েছিলেন। তবুও মাঠ প্রশাসনের যথাযথ তদারকি না থাকায় চার দেয়ালের ভেতরে এখনও শিশুদের ওপর নিষ্ঠুর নির্যাতন চলছে, যা আইনের চরম লঙ্ঘন।
আইনজীবী মুহাম্মদ নূরুল হুদা নোটিশে সাফ জানিয়েছেন, নোটিশ পাওয়ার ৭ দিনের মধ্যে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো যদি যৌথ মনিটরিং সেল গঠন এবং একটি পূর্ণাঙ্গ শিশুবান্ধব সুরক্ষানীতি প্রণয়ন না করে, তবে তিনি হাইকোর্টে রিট পিটিশন দায়ের করবেন। তিনি জানান, শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের মৌলিক সাংবিধানিক দায়িত্ব। প্রশাসনের নির্লিপ্ততার কারণে হাজারো নিষ্পাপ শিশুর শৈশব অন্ধকারে হারিয়ে যেতে দেওয়া যায় না। এ বিষয়ে সর্বোচ্চ আদালত থেকেই প্রয়োজনীয় আইনি দিকনির্দেশনা চাওয়া হবে।
আইনি এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়েছেন মানবাধিকার কর্মী ও সাধারণ অভিভাবকেরা। তাঁরা মনে করেন, কিছু বিকৃত মানসিকতার ব্যক্তির জন্য পুরো ধর্মীয় শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর মানুষের অনাস্থা তৈরি হওয়া উচিত নয়। মাদ্রাসার অভ্যন্তরে আধুনিক ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে এবং শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য নিশ্চিতে অবিলম্বে সরকারের হস্তক্ষেপ দরকার। সরকারের উচিত এই নোটিশকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে প্রতিটি শিক্ষাঙ্গনকে ১০০% নিরাপদ ও শিশুবান্ধব হিসেবে গড়ে তোলার বাস্তবসম্মত উদ্যোগ গ্রহণ করা।
















