নয়াদিল্লিতে ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন সমাপ্ত: অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি ও মধ্যপ্রাচ্যে শান্তির ডাক

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

বিশ্বের সব দেশকে অন্তর্ভুক্ত করে এক টেকসই ও সমন্বিত অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন উদীয়মান অর্থনীতির জোট ব্রিকসের শীর্ষ নেতারা। ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে আয়োজিত দুই দিনের ঐতিহাসিক শীর্ষ সম্মেলনের সমাপনী দিনে গতকাল রবিবার নেতারা এই অভিন্ন অবস্থান তুলে ধরেন। অর্থনৈতিক অগ্রগতির পাশাপাশি যুদ্ধবিধ্বস্ত মধ্যপ্রাচ্যে চলমান রক্তক্ষয়ী সংঘাত বন্ধে বিরল সমঝোতায় পৌঁছেছেন জোটভুক্ত দেশগুলোর রাষ্ট্রপ্রধানরা। তাঁরা এক কণ্ঠে ওই অঞ্চলে দ্রুত শান্তি ফিরিয়ে আনার ও চরম ধৈর্য প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছেন। নয়াদিল্লির এই সম্মেলনকে বৈশ্বিক ভূরাজনীতিতে এক বড় ধরনের মোড় ঘোরানো ঘটনা হিসেবে দেখছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা।

নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত এই গুরুত্বপূর্ণ সম্মেলনে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং, ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এবং স্বাগতিক ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিসহ সদস্যদেশগুলোর শীর্ষ নেতারা সরাসরি অংশ নেন। বিগত মে মাসে সদস্য দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে মধ্যপ্রাচ্য সংকট নিয়ে তীব্র মতবিরোধ তৈরি হয়েছিল। বিশেষ করে ইরান, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের ভিন্ন ভিন্ন অবস্থানের কারণে সে সময় কোনো যৌথ বিবৃতি দেওয়া সম্ভব হয়নি। তবে এবারের সম্মেলনে ভারতের নিবিড় কূটনৈতিক তৎপরতায় সব মতপার্থক্য দূর করে শেষ পর্যন্ত একটি শক্তিশালী সর্বসম্মত যৌথ ঘোষণাপত্র প্রকাশ করতে সক্ষম হয়েছেন নেতারা।

সম্মেলনের সমাপনী অধিবেশনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ব্রিকসের অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য ও পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর বিশেষ জোর দেন। তিনি পরিসংখ্যান তুলে ধরে বলেন, বর্তমান ব্রিকস জোট এককভাবে বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৫০% মানুষের প্রতিনিধিত্ব করছে। এছাড়া জোটভুক্ত দেশগুলো সম্মিলিতভাবে বৈশ্বিক জিডিপির প্রায় ৪০% এবং আন্তর্জাতিক সামগ্রিক বাণিজ্যের ২৫% এরও বেশি অংশ নিয়ন্ত্রণ করে। মোদি বিশ্বনেতাদের উদ্দেশে বলেন, আমাদের শক্তি কোনো একক চিন্তায় নয়, বরং আমাদের বৈচিত্র্য ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের মধ্যেই ব্রিকসের আসল শক্তি লুকিয়ে রয়েছে। আমাদের বাস্তবতা আলাদা হলেও মানবজাতির কল্যাণে এক হয়ে এগিয়ে যেতে হবে।

পশ্চিমা একমেরুকেন্দ্রিক ব্যবস্থার বিপরীতে ব্রিকসকে শক্তিশালী বিকল্প হিসেবে তুলে ধরেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। তিনি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করেন, ব্রিকস জোট বিশ্বমঞ্চে একটি নতুন, ন্যায়সঙ্গত এবং ভারসাম্যপূর্ণ বহুমেরুকেন্দ্রিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং আন্তর্জাতিক নিয়মনীতি মেনে চলার প্রয়োজনীয়তা স্মরণ করিয়ে দেন। তিনি এক চমৎকার রূপক ব্যবহার করে বলেন, বৈশ্বিক নিয়মনীতিহীন এক পৃথিবী ঠিক যেন ট্রাফিক লাইটবিহীন একটি ব্যস্ত রাস্তার মোড়ের মতো। ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ না থাকলে সেখানে যেমন দুর্ঘটনা ও চরম বিশৃঙ্খলা অবধারিত, তেমনি বিশ্বমঞ্চেও শৃঙ্খলা ছাড়া সংঘাত এড়ানো অসম্ভব।

সম্মেলনে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সাফল্য এসেছে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত নিয়ে সবার একমত হওয়া। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলার জেরে মধ্যপ্রাচ্যে যে বড় ধরনের যুদ্ধের আবহ তৈরি হয়েছিল, তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন নেতারা। সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক জ্বালানি তেলের বাজারে ব্যাপক অস্থিরতা তৈরি হয়েছে এবং প্রতিদিন শত শত কোটি ডলারের ($) আন্তর্জাতিক সমুদ্রবাণিজ্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়ছে। যৌথ ঘোষণাপত্রে বলা হয়, মধ্যপ্রাচ্য ও পশ্চিম এশিয়ায় চরম উত্তেজনা বৃদ্ধি কোনো দেশের জন্যই ভালো ফল আনবে না। তাই রক্তপাত বন্ধে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে অবিলম্বে সর্বোচ্চ আত্মসংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানানো হয়েছে।

শীর্ষ সম্মেলনের প্রথম দিনেই নেতারা সর্বসম্মতিক্রমে ‘নয়াদিল্লি ঘোষণা’ আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করেন। এই ঘোষণাপত্রে সদস্য ও অংশীদার দেশগুলোর সঙ্গে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব আরও গভীর করার অঙ্গীকার করা হয়। বিশেষ করে সদস্য দেশগুলোর নিজেদের মধ্যে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে মার্কিন ডলারের ($) ওপর মাত্রাতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে স্থানীয় মুদ্রায় লেনদেন বৃদ্ধির বিষয়ে ঐকমত্য গড়ে উঠেছে। বিশ্বের প্রভাবশালী কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর রিজার্ভ বহুমুখীকরণ এবং ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় ব্রিকস ব্যাংককে আরও বেশি তহবিল সরবরাহের তাগিদ দেওয়া হয়।

বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল বিশ্বের দেশগুলোর জন্য নয়াদিল্লির এই শীর্ষ সম্মেলনের বার্তা অত্যন্ত ইতিবাচক। পশ্চিমা আধিপত্যের বাইরে গ্লোবাল সাউথ বা দক্ষিণের দেশগুলোর নিজস্ব কণ্ঠস্বর হিসেবে ব্রিকস দিন দিন আরও কার্যকর প্ল্যাটফর্মে রূপ নিচ্ছে। অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা অর্জন, বাণিজ্য সম্প্রসারণ ও আন্তর্জাতিক বিরোধ নিষ্পত্তিতে এই জোট ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে এক নতুন ভারসাম্য তৈরি করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ