কুষ্টিয়া ও পাবনার সীমান্তবর্তী পদ্মা নদীতে আনন্দভ্রমণকালে ট্রলার দুর্ঘটনায় নিখোঁজের দীর্ঘ ৪০ ঘণ্টা পর শৈলকূপা পৌর ছাত্রদলের সদস্য সচিব রাকিবুজ্জামান রকির মরদেহ উদ্ধার হয়েছে। রবিবার সকালে পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার লক্ষ্মীকুণ্ডা ইউনিয়নের পদ্মার শাখা নদী থেকে ভাসমান অবস্থায় তাঁর নিথর দেহ উদ্ধার করেন নৌপুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা। তরুণ এই ছাত্রনেতার অকাল মৃত্যুর সংবাদ এলাকায় পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে শৈলকূপাজুড়ে নেমে আসে গভীর শোকের ছায়া। মরদেহ বাড়িতে আনার পর কবিরপুর গ্রামে হাজারো সাধারণ মানুষ প্রিয় রকিকে শেষবারের মতো দেখতে ভিড় জমান।
প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, গত শুক্রবার রাতে শতাধিক যাত্রী নিয়ে একটি বড় ইঞ্জিনচালিত ট্রলার বা নৌকা পদ্মায় আনন্দভ্রমণ শেষে ফিরছিল। ফেরার পথে পাবনার ঈশ্বরদীর পাকশীতে ঐতিহাসিক হার্ডিঞ্জ ব্রিজের ৫ নম্বর পিলারের সঙ্গে ট্রলারটির সজোরে ধাক্কা লাগে। বিকট শব্দের পর ট্রলারের ওপর থাকা যাত্রীদের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। তীব্র ঝাঁকুনিতে রকি সহ তিনজন যাত্রী সরাসরি খরস্রোতা নদীতে ছিটকে পড়েন। দুর্ঘটনার পরপরই স্থানীয়দের তৎপরতায় লিটন ও আব্দুল ওহাব নামের দুজনকে জীবিত উদ্ধার করা গেলেও রাতের অন্ধকারে পানির তোড়ে ভেসে যান রকি।
নিখোঁজের পর থেকেই পাবনা ও কুষ্টিয়ার ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল এবং নৌপুলিশ নদীতে দফায় দফায় উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করে। উদ্ধারকাজে সহায়তা করেন স্থানীয় জেলেরাও। টানা প্রায় ৪০ ঘণ্টার রুদ্ধশ্বাস অপেক্ষার পর রবিবার সকালে ঈশ্বরদীর লক্ষ্মীকুণ্ডার কাছে পদ্মার একটি শাখা নদীতে এক স্থানীয় মাঝি প্রথম একটি মরদেহ ভাসতে দেখেন। তিনি দ্রুত স্বজন ও উদ্ধারকারী দলকে খবর দেন। পরবর্তীতে পুলিশ গিয়ে নদী থেকে মরদেহটি তীরে তোলে। রকির আত্মীয়স্বজন সেখানে উপস্থিত হয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন এবং নিথর দেহটি শনাক্ত করেন। আইনি প্রক্রিয়া শেষ করে পুলিশ পরিবারের কাছে মরদেহ হস্তান্তর করে।
নিহত রাকিবুজ্জামান রকি ঝিনাইদহের শৈলকূপা উপজেলার কবিরপুর গ্রামের মৃত হাসান আলীর সন্তান ছিলেন। তিনি শৈলকূপা পৌর ছাত্রদলের সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন এবং মাঠের রাজনীতিতে তরুণদের মাঝে ভীষণ জনপ্রিয় ছিলেন। রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে সামাজিক বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকার কারণে দলমত নির্বিশেষে সর্বস্তরের মানুষ তাঁকে পছন্দ করতেন। তাঁর এমন মর্মান্তিক মৃত্যুতে রকির বাড়ির সামনে এখন হাজারো শোকার্ত মানুষের ঢল। রকির বয়োবৃদ্ধ মা ও পরিবারের সদস্যদের আহাজারিতে বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। স্বজনদের সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা হারিয়ে ফেলেছেন প্রতিবেশীরা।
বাংলাদেশে প্রতি বছর বিভিন্ন নৌভ্রমণ বা উৎসবের সময়ে নদীতে এমন হৃদয়বিদারক দুর্ঘটনা বারবার ঘটছে। নৌপরিবহন বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের অভ্যন্তরীণ নৌপথে চলাচলকারী পর্যটকবাহী নৌযানগুলোর প্রায় ৯০% কোনো ধরনের লাইফ জ্যাকেট বা প্রাথমিক জীবনরক্ষাকারী সরঞ্জাম ছাড়াই চলাচল করে। ফিটনেসবিহীন ইঞ্জিনচালিত ট্রলারের অনিয়ন্ত্রিত গতি এবং ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহনই এসব দুর্ঘটনার মূল কারণ। অথচ আধুনিক নৌনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মাত্র কয়েকশ ডলার ($) মূল্যের বয়া ও লাইফ জ্যাকেট ব্যবহার করলেই এমন মূল্যবান অনেক তাজা প্রাণ অনায়াসে বাঁচানো সম্ভব হতো। স্থানীয়রা এই নৌপথে অবিলম্বে নিয়মিত টহল জোরদারের দাবি জানিয়েছেন।
থানা ও পরিবার সূত্রে নিশ্চিত করা হয়েছে, রবিবার রাত ১০ ঘটিকায় শৈলকূপার কবিরপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয় মাঠে রকির নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এই জানাজায় অংশ নেন আইনমন্ত্রী মোঃ আসাদুজ্জামানসহ স্থানীয় প্রশাসন, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ এবং সর্বস্তরের কয়েক হাজার সাধারণ মানুষ। জানাজাকে কেন্দ্র করে স্কুল মাঠ ও আশপাশের এলাকায় কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। শৈলকূপার সাধারণ মানুষ এক বাক্যে বলছেন, রকি তাঁর সদাচরণ ও নিষ্ঠার মধ্য দিয়ে মানুষের হৃদয়ে ভালোবাসার যে স্থান তৈরি করেছিলেন, তা কোনোদিন মুছে যাবে না।
একটি মর্মান্তিক দুর্ঘটনা এক নিমেষে নিভিয়ে দিল শৈলকূপার এক সম্ভাবনাময় তরুণ নেতার উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ। পরিবার হারিয়েছে তাদের একমাত্র নির্ভরতা, আর সংগঠন হারিয়েছে রাজপথের এক নিবেদিতপ্রাণ লড়াকুকে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও ঝিনাইদহ ও কুষ্টিয়া অঞ্চলের লাখ লাখ মানুষ রকির রুহের মাগফিরাত কামনা করে শোক প্রকাশ করছেন। সাধারণ মানুষের একটাই দাবি, নৌভ্রমণের নামে পদ্মায় যাতে আর কোনো তরুণের তাজা প্রাণ এভাবে ঝরে না পড়ে, সেজন্য প্রশাসনকে এখনই নদীপথে কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে।
















