শৈলকুপায় ডেঙ্গু মোকাবিলায় বড় র‍্যালি: রাজনৈতিক ভেদাভেদ ভুলে মাঠে নামল প্রশাসন ও সাধারণ মানুষ

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

দেশজুড়ে ডেঙ্গু জ্বরের প্রকোপ বাড়ার সাথে সাথে তৃণমূল পর্যায়েও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ছে। এই পরিস্থিতিতে এডিস মশার বিস্তার রুখতে এবং সাধারণ মানুষকে সচেতন করতে ঝিনাইদহের শৈলকুপায় এক বিরাট র‍্যালি অনুষ্ঠিত হয়েছে। ‘জাতীয় ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও পরিচ্ছন্নতা অভিযান ২০২৬’ কর্মসূচির অংশ হিসেবে শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) সকালে শৈলকুপা উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে এই আয়োজন করা হয়। সকাল থেকেই উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে শত শত মানুষ ব্যানার ও ফেস্টুন হাতে উপজেলা পরিষদ চত্বরে এসে জড়ো হন। পুরো চত্বরজুড়ে তখন ডেঙ্গু সচেতনতার এক অভূতপূর্ব জাগরণ তৈরি হয়।

সকাল ১০টার দিকে উপজেলা পরিষদ প্রাঙ্গণ থেকে একটি সুবিশাল র‍্যালি বের হয়। শহরের প্রধান সড়কগুলো প্রদক্ষিণ করে র‍্যালিটি প্রায় ২ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে। এতে নেতৃত্ব দেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ মাহফুজুর রহমান। তাঁর সঙ্গে একেবারে সামনের সারিতে ছিলেন শৈলকুপা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. হুমায়ুন কবির মোল্লা এবং সহকারী কমিশনার (ভূমি) দেবাশীষ। রাস্তার দুপাশের দোকানদার ও সাধারণ পথচারীদের হাতে সচেতনতামূলক লিফলেট তুলে দেন ইউএনও নিজে। সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তা, স্বাস্থ্যকর্মী, স্থানীয় সাংবাদিক এবং বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের প্রায় ৫০০ মানুষ এই র‍্যালিতে পায়ে হেঁটে অংশ নেন।

র‍্যালির অগ্রভাগে ছিল স্থানীয় বিভিন্ন স্কুল ও কলেজের শিক্ষার্থীদের প্রাণবন্ত উপস্থিতি। তরুণ শিক্ষার্থীরা নানা সচেতনতামূলক বার্তা লেখা প্ল্যাকার্ড বহন করছিল। সেখানে লেখা ছিল ‘তিন দিনে এক দিন, জমা পানি ফেলে দিন’ কিংবা ‘আপনার সচেতনতাই রুখবে ডেঙ্গু’। শিক্ষকরা জানান, শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে যদি শৈলকুপার ৮০% পরিবারকে সচেতন করা যায়, তবে মশার কামড় থেকে বহু মানুষের জীবন রক্ষা পাবে। শিক্ষার্থীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে জমানো পানি ফেলে দেওয়ার তাগিদ দিলে সাধারণ মানুষ দ্রুত বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করতে পারে।

র‍্যালি শেষে উপজেলা চত্বরে আয়োজিত পথসভায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ মাহফুজুর রহমান স্থানীয়দের উদ্দেশে কড়া দিকনির্দেশনা দেন। তিনি বলেন, স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে আগামী ৯০ দিন ডেঙ্গু সংক্রমণের জন্য সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ সময়। তাই কেবল মুখের কথায় সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না, সবাইকে কাজে নামতে হবে। তিনি নির্দেশ দেন, প্রতিটি বাড়ির ছাদবাগান, পরিত্যক্ত পাত্র, ফুলের টব ও এসির পানি নিয়মিত ফেলে দিতে হবে। কোনো বাড়ি বা নির্মাণাধীন ভবনে এডিস মশার লার্ভা পাওয়া গেলে মোবাইল কোর্ট বসিয়ে তাৎক্ষণিক জরিমানা করা হবে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে শৈলকুপা থানার ওসি মো. হুমায়ুন কবির মোল্লা বলেন, জননিরাপত্তার পাশাপাশি স্বাস্থ্য সুরক্ষায় পুলিশ বাহিনীও মাঠে রয়েছে। থানা এবং পুলিশ ফাঁড়িগুলোর আশপাশ ১০০% পরিষ্কার রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সহকারী কমিশনার (ভূমি) দেবাশীষ জানান, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিজেদের চত্বর পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। তিনি আরও বলেন, জ্বর হলে ফার্মেসি থেকে নিজে নিজে ওষুধ না খেয়ে সরাসরি সরকারি হাসপাতালে যাওয়া উচিত। সেখানে মাত্র ৫০ থেকে ১০০ টাকায় ডেঙ্গুর এনএস১ পরীক্ষা করা হচ্ছে, যা সঠিক চিকিৎসার জন্য অত্যন্ত জরুরি।

এদিনের র‍্যালিতে সবচেয়ে চোখে পড়ার মতো দিক ছিল রাজনৈতিক নেতাদের যৌথ উপস্থিতি। উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক হুমায়ুন বাবু ফিরোজ, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর পৌর সেক্রেটারি মাসুদুর রহমান এবং গণঅধিকার পরিষদের প্রতিনিধি মেহেদী হাসান কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে র‍্যালিতে হাঁটেন। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের এমন সৌহার্দ্যপূর্ণ ঐক্যবদ্ধ উপস্থিতি শৈলকুপার সাধারণ মানুষের নজর কেড়েছে ও প্রশংসা কুড়িয়েছে। নেতৃবৃন্দ বলেন, ডেঙ্গুর জীবাণুবাহী মশা ধনী, গরিব বা কোনো দল চেনে না। তাই মানুষের জীবন বাঁচানোর এই লড়াইয়ে কোনো ভেদাভেদ নেই। তাঁরা দলীয় কর্মীদেরও পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমে যুক্ত হওয়ার নির্দেশ দেন।

সমাবেশের সমাপনী বক্তব্যে উপজেলা প্রশাসন থেকে জানানো হয়, এই আয়োজন কেবল এক দিনের আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। পৌরসভার ৯টি ওয়ার্ড এবং উপজেলার ১৪টি ইউনিয়নে প্রতি সপ্তাহে নিয়মিত এই অভিযান চলবে। পৌরসভার পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা প্রতিদিন সকাল ও বিকেলে নর্দমাগুলোতে বিশেষ তেল ও কীটনাশক স্প্রে করবেন। সাধারণ নাগরিকরা প্রশাসনের এমন উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়ে নিজেদের বাড়িঘর পরিষ্কার রাখার শপথ নেন। সম্মিলিত এই উদ্যোগের মাধ্যমে শৈলকুপাকে একটি ডেঙ্গুমুক্ত মডেল উপজেলায় রূপান্তর করার প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়।

সম্পর্কিত নিবন্ধ