ডেঙ্গুর প্রকোপ ঠেকাতে নোয়াখালীর সেনবাগে শুরু হয়েছে তিন মাসব্যাপী এক বিশেষ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও মশকনিধন অভিযান। শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) সকালে উপজেলা প্রশাসন ও সেনবাগ পৌরসভার যৌথ উদ্যোগে এই বড় কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। বর্ষার শেষভাগে এসে সারা দেশের মতো সেনবাগেও ডেঙ্গুর ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যাওয়ায় আগামী ৯০ দিনকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ বিবেচনা করছে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ। সাধারণ মানুষকে সাথে নিয়ে পৌর শহর থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত এলাকা পর্যন্ত মশামুক্ত রাখতে এই সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এর পরপরই সেনবাগের মাঠে একযোগে কাজ শুরু করে পৌরসভার পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী দল। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং পৌরসভার প্রশাসক মাঠপর্যায়ে উপস্থিত থেকে সরাসরি এই কাজের তদারকি করেন। উদ্বোধনী দিনে স্থানীয় সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারী, সেনবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি), রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি এবং সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন।
অভিযানের অংশ হিসেবে শনিবার সকাল থেকেই সেনবাগ পৌরসভার ৯টি ওয়ার্ডের বিভিন্ন এলাকায় ফগার মেশিন দিয়ে মশা মারার ওষুধ ছিটানো শুরু হয়। পৌরসভার প্রতিটি ওয়ার্ডে ২ থেকে ৩টি বিশেষ দল গঠন করে দায়িত্ব ভাগ করে দেওয়া হয়েছে। তারা প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত ড্রেন পরিষ্কার, ঝোপঝাড় কাটা এবং চুন ও ব্লিচিং পাউডার ছিটানোর কাজ করছেন। বিশেষ করে সেনবাগ বাজার, বাসস্ট্যান্ড ও জনবহুল এলাকাগুলোকে মশামুক্ত করতে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। কর্মকর্তারা জানান, শুধু ধোঁয়া বা ওষুধ ছিটিয়ে কাজ হবে না, লার্ভা ধ্বংসের ওপর ১০০% জোর দেওয়া হচ্ছে।
এই বিশেষ কর্মসূচিতে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি সহযোগিতাও যুক্ত হয়েছে। স্থানীয় সামাজিক সংস্থা ‘সৈয়দ হারুন ফাউন্ডেশন’ মশকনিধন কার্যক্রমে ওষুধ ও আধুনিক যন্ত্রপাতি দিয়ে সার্বিক পৃষ্ঠপোষকতা করছে। এছাড়া বিএনসিসির একদল উদ্যমী ক্যাডেট এবং বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে সচেতনতামূলক লিফলেট বিলি করছেন। তারা মানুষকে বোঝাচ্ছেন কীভাবে সামান্য অসচেতনতার কারণে নিজের অজান্তেই ঘরে এডিস মশার বংশবৃদ্ধি হতে পারে। বেসরকারি সংস্থাগুলো পাশে দাঁড়ানোয় মাঠের কাজে বাড়তি শক্তি যোগ হয়েছে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা জানান, প্রায় ৫০% থেকে ৬০% এডিস মশার লার্ভা পাওয়া যায় বাসাবাড়ির ছাদবাগান, ফুলের টব, নির্মাণাধীন ভবনের পানির ট্যাংক এবং ফেলে রাখা ডাবের খোসায়। সেনবাগ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্রে জানা গেছে, ডেঙ্গু আক্রান্তদের জন্য হাসপাতালে আলাদা কর্নার চালু করা হয়েছে। এছাড়া মাত্র ৫০ থেকে ১০০ টাকার মধ্যে সরকারিভাবে ডেঙ্গু পরীক্ষার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। প্রশাসন স্পষ্ট জানিয়েছে, শুধু পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের ওপর ভরসা করে বসে থাকলে চলবে না। প্রতিটি পরিবারকে সপ্তাহে অন্তত ১ দিন ১০ মিনিট সময় দিয়ে নিজেদের আঙিনা পরিষ্কার রাখতে হবে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জানান, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে প্রশাসন কঠোর অবস্থানে রয়েছে। কোনো বাড়ি বা প্রতিষ্ঠানে বারবার জমে থাকা পানি পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। সেনবাগ পৌর এলাকায় প্রায় ৩০ হাজার মানুষের বসবাস। সবার স্বাস্থ্য সুরক্ষার কথা ভেবে পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের সাপ্তাহিক ছুটির দিনেও বিশেষ রোস্টার করে কাজে নামানো হচ্ছে। এছাড়া প্রতিটি ওয়ার্ডে সচেতনতামূলক উঠান বৈঠক এবং মসজিদের ইমামদের মাধ্যমে জুমার খুতবায় পরিচ্ছন্নতার বার্তা ছড়িয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
সেনবাগের সাধারণ নাগরিকরা মনে করছেন, প্রশাসনের এই সমন্বিত উদ্যোগ অত্যন্ত সময়োপযোগী। তবে তিন মাসের এই অভিযান যেন কেবল শুরুর কয়েক দিনেই সীমাবদ্ধ না থাকে, সেদিকে কড়া নজর রাখতে হবে। শিক্ষার্থী, তরুণ সমাজ, জনপ্রতিনিধি ও সাধারণ মানুষের ১০০% সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে সেনবাগকে ডেঙ্গুমুক্ত রাখা সম্ভব। স্থানীয় প্রশাসনও সাধারণ মানুষকে সঙ্গে নিয়ে একটি পরিচ্ছন্ন, স্বাস্থ্যকর ও নিরাপদ সেনবাগ গড়ে তোলার দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
















