ডেঙ্গুর চরম মৌসুমে মশার ওষুধ ধার করল দক্ষিণ সিটি: সংকটের মুখে উত্তর সিটির দ্বারস্থ ডিএসসিসি

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

রাজধানীজুড়ে যখন ডেঙ্গুর প্রকোপ মারাত্মক রূপ নিয়েছে, ঠিক তখনই নিজেদের মজুত ফুরিয়ে যাওয়ায় মশা মারার ওষুধ ধার করতে হয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনকে (ডিএসসিসি)। উড়ন্ত মশা নিধনে নিজস্ব কীটনাশক না থাকায় প্রতিবেশী ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) কাছ থেকে ১৬ হাজার লিটার মেলাথিয়ন কীটনাশক ধার এনেছে সংস্থাটি। গত ১ সেপ্টেম্বর উত্তর সিটির কাছ থেকে এই জরুরি ওষুধ নিজেদের ভাণ্ডারে নিয়ে যায় দক্ষিণ সিটি। ডেঙ্গুর এমন ভরা মৌসুমে শহরের অন্যতম প্রধান সেবামূলক সংস্থার এমন কাণ্ডজ্ঞানহীন প্রস্তুতিহীনতা ও ওষুধের ঘাটতি নিয়ে সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও চরম হতাশা তৈরি হয়েছে।

জানা গেছে, গত ২৪ আগস্ট ঢাকা দক্ষিণ সিটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) খয়বর রহমান উত্তর সিটির সিইওকে একটি জরুরি চিঠি পাঠান। ওই চিঠিতে দক্ষিণ সিটির বিভিন্ন ওয়ার্ডে ছিটানোর জন্য ৭০ হাজার লিটার পূর্ণাঙ্গ মশা মারার কীটনাশক বা অ্যাডাল্টিসাইড ধার দেওয়ার অনুরোধ করা হয়। চিঠিতে দক্ষিণ সিটি স্বীকার করে, তাদের নির্ধারিত ঠিকাদারের সরবরাহ করা ২ লাখ ২১ হাজার ৫২০ লিটার ডেলটামেথ্রিন কীটনাশকের কার্যকারিতা পরীক্ষার কাজ চলছিল। একই সঙ্গে মেলাথিয়ন সরবরাহের নতুন কার্যাদেশ দিতেও দেরি হয়ে যায়। ফলে ল্যাবরেটরি থেকে ওষুধের রিপোর্ট পেতে বিলম্ব হওয়ায় মাঠপর্যায়ে মশা নিধন কার্যক্রম সচল রাখতে উত্তর সিটির কাছে হাত পাততে বাধ্য হয় তারা।

ডিএনসিসি সূত্র জানায়, দক্ষিণ সিটির অনুরোধ পাওয়ার পর গত ৩০ আগস্ট তাদের মনোনীত প্রতিনিধির কাছে ১৬ হাজার লিটার কীটনাশক হস্তান্তর করা হয়। উত্তর সিটির হিসাব অনুযায়ী, প্রতি লিটার মেলাথিয়নের বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ৪৫০ টাকা। সেই হিসেবে এই ১৬ হাজার লিটার ওষুধের মোট দাম দাঁড়ায় প্রায় ৭২ লাখ টাকা, যা আন্তর্জাতিক মুদ্রায় প্রায় ৬০ হাজার ডলারের ($৬০,০০০) সমপরিমাণ। তবে দক্ষিণ সিটির ৭৫টি ওয়ার্ডের বিপুল আয়তন বিবেচনায় এই পরিমাণ ওষুধ নিতান্তই সামান্য। সংস্থাটিতে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৪ হাজার ৫৭০ লিটার অ্যাডাল্টিসাইড প্রয়োজন হয়। ফলে উত্তর সিটি থেকে ধার করা এই ওষুধ দিয়ে তাদের নিয়মিত ফগিং কার্যক্রম চলেছে মাত্র ৩ থেকে ৪ দিন।

কীটনাশক ধার দেওয়া প্রসঙ্গে উত্তর সিটির ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও সচিব মুহাম্মদ আসাদুজ্জামান জানান, জনস্বার্থ ও ডেঙ্গুর জরুরি পরিস্থিতি বিবেচনায় তারা এই সহায়তা দিয়েছেন। তবে দক্ষিণ সিটি কর্তৃপক্ষ এই কীটনাশকের সমপরিমাণ অর্থ সরাসরি ঠিকাদারকে বুঝিয়ে দিলে উত্তর সিটি তাদের অভ্যন্তরীণ হিসাব সমন্বয় করে নেবে। অন্যদিকে দক্ষিণ সিটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা খয়বর রহমান দাবি করেন, ল্যাবরেটরি থেকে পরীক্ষার ছাড়পত্র পাওয়ার পর তাদের সংকট কেটে গেছে। গত মঙ্গলবার থেকেই তারা নিজেদের কেনা নতুন কীটনাশক দিয়ে মশা মারছেন এবং ধার নেওয়া ওষুধ দ্রুত ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়াও চালাচ্ছেন।

দুই সিটির এমন প্রশাসনিক টানাপোড়েনের মধ্যেই সারা দেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতি অত্যন্ত বিপজ্জনক মোড় নিয়েছে। সরকারি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত দীর্ঘ সাত মাসে সারা দেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছিলেন ১৫ হাজার ৩১০ জন এবং মারা যান ৫৪ জন। কিন্তু আগস্ট মাসে এসেই ডেঙ্গু পরিস্থিতি রীতিমতো বিস্ফোরক হয়ে ওঠে। কেবল আগস্টের ৩১ দিনেই আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৩৫ হাজার ৮৪৬ জনে, যা বছরের প্রথম সাত মাসের মোট রোগীর তুলনায় প্রায় ১৩৪% বেশি। একই মাসে ডেঙ্গুতে ৯৭ জনের প্রাণহানি ঘটে, যা আগের সাত মাসের তুলনায় প্রায় ৮০% বেশি।

চলতি সেপ্টেম্বর মাসেও এই মশাবাহিত প্রাণঘাতী ভাইরাসের আক্রমণ আরও তীব্র হয়েছে। মাসের প্রথম ৯ দিনেই নতুন করে ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১১ হাজার ৯২ জন রোগী, যা আগস্ট মাসের মোট সংক্রমণের প্রায় ৩১%। রাজধানীর হাসপাতালগুলোতে রোগীদের জায়গা দিতে হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসকেরা। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মশার পিক মৌসুমে ওষুধ পরীক্ষা আর সরবরাহের অজুহাতে হাত গুটিয়ে বসে থাকা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। যেখানে শতভাগ (১০০%) প্রস্তুতি রাখা দরকার ছিল, সেখানে ওষুধ ধার করে মশা নিধনের এই ব্যর্থতা নগরবাসীকে ডেঙ্গুর মুখে ঠেলে দেওয়ারই নামান্তর।

সম্পর্কিত নিবন্ধ