ভালোবেসে নিজের ধর্ম বদলে মুসলিম হয়েছিলেন মনিকা রাণী বড়াই। নতুন নাম নিয়েছিলেন মারিয়া ইসলাম। আশা ছিল পছন্দের মানুষের হাত ধরে সারা জীবন কাটিয়ে দেবেন। কিন্তু বিয়ের মাত্র ৪৮ ঘণ্টা পার হতে না হতেই সেই ভালোবাসার সাজানো সংসার ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। প্রাপ্তবয়স্ক এক তরুণীর চোখের পানি ও বুকফাটা চিৎকারকে পুরোপুরি উপেক্ষা করে খোদ থানা চত্বর থেকেই তাকে জোর করে একটি মাইক্রোবাসে তুলে নিয়ে গেছে তার পরিবারের লোকজন। ঘটনাটি ঘটেছে ঝিনাইদহের শৈলকুপা থানা চত্বরে। এক সাবালিকা মেয়ের এমন প্রকাশ্য আহাজারিতে উপস্থিত সাধারণ মানুষের চোখ ভিজে উঠলেও মন গলেনি পরিবারের লোকজনের।
গ্রামের ঘনিষ্ঠ সূত্রে জানা যায়, শৈলকুপা উপজেলার নিত্যানন্দনপুর ইউনিয়নের খালফলিয়া গ্রামের বিপুল বড়াইয়ের মেয়ে মনিকা এবং একই গ্রামের লিয়াকত বিশ্বাসের ছেলে মো. রাকিবুল ইসলামের মধ্যে বেশ কিছুদিন ধরে প্রেমের সম্পর্ক চলছিল। দুই ভিন্ন ধর্মের হওয়ায় তাদের এই সম্পর্কে পরিবারের সমর্থন পাওয়ার সম্ভাবনা ছিল শূন্য বা ০%। সব সামাজিক ভয় ও রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে দুজনে একসঙ্গে জীবন কাটানোর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেন। সেই পথ ধরে চলতি বছরের ৭ জুলাই মনিকা নিজের ইচ্ছায় ঝিনাইদহ জজ কোর্টে নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে সনাতন ধর্ম ত্যাগ করে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। ধর্মান্তরিত হওয়ার পর তার নতুন নাম হয় মারিয়া ইসলাম। এরপর গত ৮ সেপ্টেম্বর আইন মেনে রেজিস্ট্রি কাবিনে রাকিবুলের সঙ্গে তার বিয়ে সম্পন্ন হয়।
বিয়ে সম্পন্ন করে নিজেদের স্বপ্নের সংসার শুরু করেছিলেন এই নবদম্পতি। কিন্তু সেই আনন্দ দুই দিনও স্থায়ী হলো না। তরুণীর পরিবারের পক্ষ থেকে নানা চাপ সৃষ্টি করে একপর্যায়ে মারিয়াকে শৈলকুপা থানায় নিয়ে আসা হয়। এরপর থানা চত্বরেই তৈরি হয় এক চরম নাটকীয় ও হৃদয়বিদারক দৃশ্য। মারিয়ার নিজস্ব মতামত কিংবা ইচ্ছাকে বিন্দুমাত্র পাত্তা না দিয়ে স্বজনরা তাকে টেনেহিঁচড়ে গাড়িতে তোলার চেষ্টা করে। এ সময় মারিয়া বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ে বলতে থাকেন, “আমি বাড়ি ফিরে যাব না, আমি আমার স্বামীর কাছেই থাকব। আমাকে জোর করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।” তরুণীর এই আর্তনাদে পুরো থানা এলাকার বাতাস ভারী হয়ে উঠলেও বলপ্রয়োগ করেই তাকে গাড়িতে তুলে চম্পট দেয় স্বজনরা।
দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী ১৮ বছর পার হওয়া যেকোনো প্রাপ্তবয়স্ক নারী বা পুরুষের নিজের ইচ্ছায় ধর্ম বাছাই ও বিয়ে করার শতভাগ (১০০%) সাংবিধানিক অধিকার রয়েছে। মারিয়া একজন সাবালিকা হওয়া সত্ত্বেও প্রকাশ্যে সবার সামনে তাকে এভাবে জোর করে তুলে নিয়ে যাওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন প্রত্যক্ষদর্শীরা। উপস্থিত লোকজন জানান, তরুণীটি বাঁচানোর জন্য আশপাশের মানুষের দিকে তাকিয়ে বারবার হাতজোড় করে আকুতি জানাচ্ছিলেন। অথচ সেই সময় উপস্থিত কেউই তাকে পরিবারের সেই জবরদস্তি থেকে রক্ষা করতে এগিয়ে আসেনি।
ঘটনার পর থেকে গভীর আশঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন স্বামী রাকিবুল ইসলাম ও তার পরিবারের সদস্যরা। রাকিবুলের পরিবারের অভিযোগ, মারিয়াকে তার স্বজনরা কোনোভাবেই নিজের বাড়িতে রাখবে না। তারা আশঙ্কা করছেন, সীমান্ত পারাপারের দালালদের হাতে কয়েকশ ডলার ($) বা মোটা অঙ্কের টাকা তুলে দিয়ে যেকোনো মুহূর্তে মারিয়াকে অবৈধভাবে ভারতে পাঠিয়ে দেওয়া হতে পারে। রাকিবুল কাঁদতে কাঁদতে বলেন, মারিয়া এখন তার বিবাহিত স্ত্রী। স্ত্রীর নিরাপত্তা নিয়ে তিনি চরম উদ্বেগে আছেন। তাই মারিয়াকে দ্রুত উদ্ধার করে তার কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য তিনি প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ের হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে খালফলিয়া গ্রামে বর্তমানে চরম চাপা উত্তেজনা বিরাজ করছে। মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, প্রাপ্তবয়স্ক একজন নাগরিককে এভাবে জিম্মি করা স্পষ্ট আইনের লঙ্ঘন। জোর করে কাউকে তুলে নেওয়ার অধিকার কারও নেই। স্থানীয় সচেতন মহল আশা করছে, পুলিশ প্রশাসন দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নিয়ে মারিয়াকে উদ্ধার করবে এবং কারোর ব্যক্তিগত স্বাধীনতা যেন ভূলুণ্ঠিত না হয়, সেই বিষয়ে কড়া পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।
















