র‍্যাব বিলুপ্ত করে সংসদে এসআরবি বিল পাস: বিরোধী দলের তীব্র আপত্তি, সাইনবোর্ড বদলের অভিযোগ

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

জাতীয় সংসদে বিরোধী দলের তীব্র আপত্তির মুখে বহুল আলোচিত ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)’ বিল পাস হয়েছে। সংসদ অধিবেশনে কণ্ঠভোটে বিলটি পাস হওয়ার মাধ্যমে দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে পরিচালিত র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন বা র‍্যাব আনুষ্ঠানিকভাবে বিলুপ্ত হলো। তবে বিরোধী দল এই পদক্ষেপের কড়া সমালোচনা করে একে কেবল ‘সাইনবোর্ড পরিবর্তন’ ও ‘নতুন বোতলে পুরোনো মদ’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। তাদের অভিযোগ, র‍্যাবের মূল কাঠামো, জনবল ও ক্ষমতা বহাল রেখেই সরকার নতুন মোড়কে একই বাহিনীকে ফিরিয়ে এনেছে।

বিলের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান বলেন, দেশের সাধারণ মানুষ ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল র‍্যাবের বিলুপ্তি। বিরোধী দলের সদস্যরা জানান, নতুন নামে আরেকটি সমান্তরাল বাহিনী গঠন করা কোনোভাবেই যুক্তিযুক্ত নয়। সংসদ সদস্য নুরুল ইসলাম ও নাজিবুর রহমান ২০১৪ সালের নারায়ণগঞ্জের আলোচিত ৭ খুনের ঘটনা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায়ে ২০২১ সালের ১০ ডিসেম্বর যুক্তরাষ্ট্র বাহিনীটির ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল। মাত্র ৪ কর্মদিবসের মধ্যে তাড়াহুড়ো করে আইনটি পাস করায় সুষ্ঠু বিচার প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হতে পারে বলে তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেন।

পাস হওয়া বিলের বিধান অনুযায়ী, বিলুপ্ত র‍্যাবের সব জনবল, অস্ত্রশস্ত্র, যানবাহন, দায়দেনা, চুক্তি, নগদ অর্থ এবং ব্যাংকে থাকা তহবিল সরাসরি এসআরবির কাছে চলে যাবে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বিরোধী দলের আপত্তির জবাবে জানান, র‍্যাবের শত শত কোটি টাকা এবং কয়েক মিলিয়ন ডলার ($) মূল্যের উন্নত প্রযুক্তি ও গোয়েন্দা সরঞ্জাম রয়েছে। এই বিপুল রাষ্ট্রীয় সম্পদ রক্ষা করার লক্ষ্যেই নতুন বাহিনীর কাছে তা স্থানান্তর করা হয়েছে, যাতে সরকারের অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় না হয়। তিনি জোর দিয়ে বলেন, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতেই সরকার র‍্যাব বিলুপ্তির চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

নতুন আইনের আওতায় এসআরবিকে বাংলাদেশ পুলিশের অধীন একটি বিশেষায়িত ইউনিট হিসেবে গঠন করা হয়েছে। অন্যূন অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (অতিরিক্ত আইজিপি) পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তা এই ইউনিটের মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। তবে মানবাধিকারকর্মীদের আপত্তি সত্ত্বেও বাহিনীটিতে সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের যুক্ত করার সুযোগ রাখা হয়েছে। সংবিধানের ১৫২ অনুচ্ছেদে থাকা ‘শৃঙ্খলা বাহিনী’র সংজ্ঞা ব্যবহার করে পুলিশ ছাড়াও সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর সদস্যদের প্রেষণে এসআরবিতে পদায়নের পথ খোলা রাখা হয়েছে।

বিশিষ্ট মানবাধিকারকর্মী নূর খান এই মিশ্র কাঠামোর সমালোচনা করে জানান, অভ্যন্তরীণ অপরাধ দমন ও নাগরিক নিরাপত্তা রক্ষার কাজ পুরোপুরি সাধারণ পুলিশের হওয়া উচিত। সামরিক বাহিনীর সদস্যদের দিয়ে দৈনন্দিন আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করার অতীত অভিজ্ঞতা কখনোই ভালো ছিল না। নতুন আইনে এসআরবিকে নিজস্ব হাজতখানা, মালখানা ও জিজ্ঞাসাবাদ কক্ষ পরিচালনার পাশাপাশি ফৌজদারি অপরাধ তদন্ত, তল্লাশি, মালামাল জব্দ ও গ্রেপ্তারের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। ফলে মাঠপর্যায়ে এই বাহিনী র‍্যাবের মতোই ক্ষমতা পাবে বলে পর্যবেক্ষকদের ১০০% নিশ্চিত ধারণা তৈরি হয়েছে।

একই দিনে জাতীয় সংসদে ‘আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন) বিল-২০২৬’ নামের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ আইন পাস হয়েছে। এর মাধ্যমে ২০০৩ সালের পুরোনো এপিবিএন অর্ডিন্যান্স রহিত করা হলো। নতুন আইনের মাধ্যমে এপিবিএনকেও কোনো অপরাধস্থলে প্রবেশ, তল্লাশি, আলামত জব্দ এবং ফৌজদারি অপরাধ সরাসরি তদন্ত ও আসামি গ্রেপ্তারের বিশেষ ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। তবে নিজস্ব গোপনীয়তা বজায় রাখতে যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া বাহিনীর সদস্যদের গণমাধ্যমে কোনো প্রকার তথ্য প্রকাশ করার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।

সব মিলিয়ে র‍্যাব বিলুপ্তি ও নতুন বিশেষায়িত বাহিনী এসআরবি গঠন নিয়ে দেশজুড়ে রাজনৈতিক অঙ্গন ও সাধারণ মানুষের মাঝে তুমুল বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সরকারি দল বিষয়টিকে কার্যকর আইনি সংস্কার ও নির্বাচনী অঙ্গীকার পূরণ হিসেবে তুলে ধরছে। অন্যদিকে বিরোধী দল ও নাগরিক সমাজের মতে, কাজের ধরন না বদলে শুধু পোশাক আর নাম পরিবর্তন করলে মানবাধিকার পরিস্থিতির কোনো গুণগত উন্নতি হবে না। সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, নতুন এই বাহিনী যেন কোনো রাজনৈতিক প্রভাবে না জড়িয়ে দেশের আইনের প্রতি অনুগত থাকে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ