ঝিনাইদহের শৈলকুপা থানা পুলিশের দিন ও রাত্রিকালীন টানা বিশেষ অভিযানে ৭ জন মাদকসেবীকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। আটক ব্যক্তিদের বিজ্ঞ আদালতে সোপর্দ করার পর আদালত বিভিন্ন মেয়াদে তাদের সশ্রম কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ডের আদেশ দিয়েছেন। মাদক ও অপরাধমুক্ত শৈলকুপা গড়ে তোলার লক্ষ্যে পুলিশ প্রশাসন এই সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনা করে। শৈলকুপা থানার বিভিন্ন প্রান্তে পরিচালিত এই পদক্ষেপে মাদক সংশ্লিষ্ট চক্রগুলোর মাঝে বড় ধরনের আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। পুলিশ জানায়, মাদকের বিরুদ্ধে ঘোষিত জিরো টলারেন্স নীতির অংশ হিসেবেই এই তাৎক্ষণিক ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
অভিযানের প্রথম দিনে শৈলকুপার একাধিক চিহ্নিত স্পট থেকে ৬ জন মাদকসেবীকে হাতেনাতে আটক করে পুলিশ। তাদের বিরুদ্ধে ২০১৮ সালের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের ৩৬(৫) ধারা অনুযায়ী দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এরপর প্রয়োজনীয় নথিপত্রসহ তাদের বিজ্ঞ আদালতে উপস্থাপন করা হলে আদালত সাক্ষ্য-প্রমাণ বিবেচনা করে শাস্তির রায় ঘোষণা করেন। আদালতের এই আদেশের ফলে এলাকার মাদক কারবারি ও মাদকসেবীদের জন্য একটি কঠোর বার্তা পৌঁছেছে বলে সাধারণ মানুষ মনে করছেন।
প্রথম দিনের অভিযানে সাজাপ্রাপ্তদের মধ্যে কাচেরকোল গ্রামের কাজল মণ্ডলের ছেলে মোঃ কাজল এবং দুধসর গ্রামের মৃত রবিউল ইসলামের ছেলে মোঃ অমিত হাসানকে ৪ মাস করে সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়। একই সঙ্গে তাদের প্রত্যেককে ১০০০ টাকা করে জরিমানা করা হয়েছে, যা অনাদায়ে আরও ১০ দিন সশ্রম কারাদণ্ড খাটতে হবে। অন্যদিকে গোয়ালখালি গ্রামের মোঃ সামিউল্লাহ পরাগকে আদালত ৪ মাসের সশ্রম কারাদণ্ড ও ৫০০ টাকা অর্থদণ্ড দিয়েছেন, অনাদায়ে তাকে ১০ দিন কারাভোগ করতে হবে।
এছাড়া একই দিনে আটক কাচেরকোল এলাকার চাদ আলীর ছেলে মোঃ রকিকে আদালত ৬ মাসের সশ্রম কারাদণ্ড ও ৫০০ টাকা জরিমানা করেন। দুধসর গ্রামের জান্নাত এ নুর উপমকে আদালত ৬ মাস ১৫ দিনের সশ্রম কারাদণ্ড এবং ১০০০ টাকা অর্থদণ্ড দেন, অনাদায়ে আরও ৭ দিনের সাজা ভোগ করতে হবে। কাজীপাড়ার মোঃ মেহেদী হাসান রকিবকে আদালত ৬ মাসের সশ্রম কারাদণ্ড ও ১০০০ টাকা অর্থদণ্ড দেন। অর্থদণ্ড পরিশোধ না করলে তাকেও অতিরিক্ত ৭ দিন কারাদণ্ড ভোগ করার নির্দেশ দিয়েছেন বিচারক।
পরের দিন শৈলকুপা থানা পুলিশ তাদের বিশেষ অভিযান অব্যাহত রেখে বারইপাড়া এলাকা থেকে মোঃ হৃদয় হোসেন (২৪) নামের আরেক মাদকসেবীকে আটক করে। হৃদয় হোসেন ওই এলাকার আব্দুল হালিম মোল্লার ছেলে। তাকে আদালতে পাঠানো হলে বিজ্ঞ বিচারক তাকে ৪ মাসের সশ্রম কারাদণ্ড দেন। একই সাথে তাকে ২০০০ টাকা অর্থদণ্ড এবং তা দিতে ব্যর্থ হলে আরও ১৫ দিন বিনাশ্রম কারাদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়। আদালত প্রাঙ্গণ থেকে সাজাপ্রাপ্তদের কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে জেলা কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
শৈলকুপা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোঃ হুমায়ূন কবির মোল্লা বলেন, যুবসমাজকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে পুলিশ প্রশাসন ১০০% আন্তরিকতার সাথে কাজ করছে। তিনি জানান, প্রত্যন্ত এলাকায় মাদকের বিস্তার রোধে দিন ও রাতের বিশেষ নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে যার মূল্য কয়েক হাজার ডলার ($) সমমানের, এমন ক্ষতিকর মাদকও অনেক সময় নানা কৌশলে ছড়ানোর চেষ্টা চলে। এর ফলে সমাজে পারিবারিক অশান্তি ও অপরাধ বেড়ে যায় প্রায় ৮০% হারে। মাদক নির্মূল না হওয়া পর্যন্ত কোনো অপরাধীকে ছাড় দেওয়া হবে না।
স্থানীয় এলাকাবাসী পুলিশের এই কঠোর উদ্যোগকে আন্তরিকভাবে স্বাগত জানিয়েছেন। তারা জানান, শৈলকুপার বিভিন্ন ইউনিয়নের মোড়ে মোড়ে মাদকসেবীদের প্রকাশ্য আনাগোনা সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনকে অতিষ্ঠ করে তুলেছিল। বিশেষ করে তরুণদের বিপথগামী হওয়া নিয়ে অভিভাবকরা দীর্ঘ দিন ধরে চরম উদ্বেগে দিন কাটাচ্ছিলেন। পুলিশের এই ধরনের নিয়মিত অভিযান তরুণ প্রজন্মকে মাদকের মরণফাঁদ থেকে ফিরিয়ে আনতে অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখবে। মানুষ এখন অনেকটাই স্বস্তিতে চলাফেরা করছে এবং এলাকায় চুরি-ছিনতাইয়ের ঘটনাও উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে।
ওসি মোঃ হুমায়ূন কবির মোল্লা আরও উল্লেখ করেন যে, একটি সুন্দর ও অপরাধমুক্ত সমাজ গড়তে পুলিশ ও সাধারণ মানুষের পারস্পরিক সহযোগিতা খুব বেশি প্রয়োজন। মাদক কারবারিদের যেকোনো গোপন তথ্য অবিলম্বে নিকটস্থ থানায় জানানোর জন্য তিনি সবার প্রতি বিনীত অনুরোধ জানান। তথ্যদাতার পরিচয় শতভাগ গোপন রাখার নিশ্চয়তা দিয়ে তিনি বলেন, শৈলকুপাকে একটি নিরাপদ ও মাদকমুক্ত জনপদ হিসেবে গড়ে তুলতে থানা পুলিশ সবসময় প্রস্তুত রয়েছে এবং আগামী দিনগুলোতেও এমন সাঁড়াশি অভিযান কোনো বিরতি ছাড়াই চলমান থাকবে।
















