নানা অনিয়ম, আর্থিক অসদাচরণ এবং সনদে ভুল তথ্য দেওয়ার অভিযোগের মুখে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের পরিচালকের পদ ছাড়লেন সায়মা ওয়াজেদ পুতুল। তিনি ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মেয়ে। বুধবার তিনি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক তেদরোস আধানোম গেব্রেয়াসুসের কাছে তার আনুষ্ঠানিক পদত্যাগপত্র জমা দেন। আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্স ওই পদত্যাগপত্রের সত্যতা যাচাই করে বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বেশ কিছুদিন ধরেই সায়মা ওয়াজেদের বিরুদ্ধে চীন সফরে আর্থিক দুর্নীতি ও শিক্ষাগত যোগ্যতার তথ্য জালিয়াতির অভিযোগ তদন্ত করছিল। তবে সায়মা শুরু থেকেই এসব অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার করে আসছেন। সফর ব্যয়ের বিষয়ে তার আইনজীবীরা ডব্লিউএইচওকে জানান, একজন ব্যক্তিগত সহকারীর সাধারণ ভুলের কারণে ভ্রমণ খরচের হিসাবে কিছু গরমিল হয়েছিল, যার আর্থিক পরিমাণ ছিল মাত্র ৯০১ ডলার। এছাড়া বাংলাদেশে প্রভাব খাটিয়ে অবৈধ উপায়ে সরকারি প্লট নেওয়ার অভিযোগও খতিয়ে দেখছিল সংস্থাটি। একই সঙ্গে সূচনা ফাউন্ডেশনের নামে দেশের ২০টি ব্যাংক থেকে প্রায় ৩৩ কোটি টাকা অনিয়মের মাধ্যমে নেওয়ার অভিযোগও তার বিরুদ্ধে ওঠে।
সংস্থার প্রধানের কাছে পাঠানো পদত্যাগপত্রে সায়মা ওয়াজেদ নিজের চরম অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তিনি লেখেন, এই অঞ্চলের সদস্য দেশগুলোর স্বাস্থ্যসেবায় কাজ করার লক্ষ্য নিয়েই তিনি নির্বাচনে জিতে এসেছিলেন। কিন্তু ডব্লিউএইচওর শীর্ষ নেতৃত্ব শুরু থেকেই তাকে দায়িত্ব পালনে পদে পদে বাধা দিচ্ছে। তিনি উল্লেখ করেন, নেতৃত্বের প্রতি তার আর কোনো ধরনের আস্থা বা বিশ্বাস অবশিষ্ট নেই। পাশাপাশি সংস্থাটি তাকে প্রায় এক বছর কোনো বেতন ছাড়াই ছুটিতে রাখে। ফলে দীর্ঘ সময় পারিশ্রমিক না পেয়ে তিনি চরম আর্থিক সংকটের মুখে পড়েছেন এবং এই কারণেই তিনি স্বেচ্ছায় সরে দাঁড়ানোর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
২০২৩ সালের নভেম্বর মাসে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সদস্য দেশগুলোর ভোটে সায়মা ওয়াজেদ পাঁচ বছরের মেয়াদে এই গুরুত্বপূর্ণ পদে বিজয়ী হন। এরপর ২০২৪ সালের ১ ফেব্রুয়ারি তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে নয়াদিল্লির আঞ্চলিক দপ্তরে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার তীব্র আন্দোলনের মুখে তার মা শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রীর পদ ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যান। এরপর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নিলে শেখ পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের পাশাপাশি সায়মার বিরুদ্ধেও দুর্নীতির অনুসন্ধান শুরু করে দুদক। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৫ সালের জুলাই মাসে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা তাকে বাধ্যতামূলক অবৈতনিক ছুটিতে পাঠায়।
নিজের শিক্ষাগত যোগ্যতার পক্ষে সাফাই গেয়ে সায়মা দাবি করেন, তিনি কোনো অসত্য তথ্য দেননি। বাংলাদেশে অটিজম নিয়ে কাজের স্বীকৃতি হিসেবে একটি বিশ্ববিদ্যালয় তাকে সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি দেয় এবং এই বিষয়ে তিনি ডব্লিউএইচও প্রধানকে আগেই খোলাখুলি জানিয়েছিলেন। অন্যদিকে ঢাকার পূর্বাচলে প্লট বরাদ্দের বিষয়ে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক এই সংস্থায় যোগদানের বহু আগেই তিনি জমিটি পেয়েছিলেন। শেখ মুজিবুর রহমানের পরিবারের সদস্য হিসেবে একটি বিশেষ আইনের অধীনে তিনি বৈধভাবেই ওই জমির মালিকানা পেয়েছিলেন বলে দাবি করেন।
রয়টার্সের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে সরকার পতনের পর শেখ হাসিনা এবং তার রাজনৈতিক সহযোগীদের প্রায় ৮০% ব্যক্তিই এখন নানা ফৌজদারি ও দুর্নীতির মামলার মুখোমুখি। অনেকে গ্রেপ্তার এড়াতে বিদেশে আত্মগোপনে আছেন। এমন টালমাটাল রাজনৈতিক বাস্তবতায় সায়মার পদত্যাগ শেখ পরিবারের প্রভাব হারানোর আরেকটি বড় দৃষ্টান্ত। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ডব্লিউএইচওর আঞ্চলিক পরিচালকের পদটি অত্যন্ত ক্ষমতাধর, কারণ এই অঞ্চলের প্রায় ২০০ কোটি মানুষের জরুরি স্বাস্থ্যসেবা এবং নীতি প্রণয়ন তাদের নেতৃত্বেই পরিচালিত হয়।
ডব্লিউএইচও জানিয়েছে, তারা শিগগিরই নতুন আঞ্চলিক পরিচালক নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু করতে যাচ্ছে। সংস্থার অভ্যন্তরীণ সূত্রের তথ্যমতে, আগামী ১২ অক্টোবর নতুন প্রার্থীর মনোনয়ন আহ্বান করা হবে। ডিসেম্বরে প্রার্থীদের নথিপত্র যাচাই-বাছাই শেষে আগামী ২০২৬ সালের ২৪ জানুয়ারি নতুন পরিচালক নির্বাচনে ভোট দেবেন সদস্য দেশগুলোর প্রতিনিধিরা।
















