শৈলকুপায় আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস পালন: ঝরে পড়া রোধ ও দক্ষ মানবসম্পদ গড়ার অঙ্গীকার

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

‘মানুষ, পৃথিবী ও সমৃদ্ধির জন্য সাক্ষরতা’—এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে ঝিনাইদহের শৈলকুপায় যথাযোগ্য মর্যাদায় আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস পালিত হয়েছে। শৈলকুপা উপজেলা প্রশাসন ও উপজেলা উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর যৌথ উদ্যোগে দিনটি উপলক্ষে এক বর্ণাঢ্য র‍্যালি ও সচেতনতামূলক আলোচনার আয়োজন করা হয়। মঙ্গলবার সকালে উপজেলা পরিষদ চত্বর থেকে এই বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা বের হয়ে শহরের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে। উপজেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা শিক্ষা অনুরাগী মানুষ এই কর্মসূচিতে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেন।

সকাল ৯টার দিকে অনুষ্ঠিত এই শোভাযাত্রায় বিভিন্ন প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, শিক্ষক, সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তা এবং স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা সারিবদ্ধভাবে যোগ দেন। অংশগ্রহণকারীদের হাতে ছিল সাক্ষরতার গুরুত্ব তুলে ধরা নানা রঙের আকর্ষণীয় প্ল্যাকার্ড ও ব্যানার। ব্যানারগুলোতে বাংলায় ‘মানুষ, পৃথিবী ও সমৃদ্ধির জন্য সাক্ষরতা’ এবং ইংরেজিতে ‘Literacy for people, the planet and prosperity’ স্লোগানটি লেখা ছিল। র‍্যালিতে অংশ নেওয়া শত শত শিক্ষার্থী সাধারণ মানুষকে নিরক্ষরতা দূর করার আহ্বান জানিয়ে নানা স্লোগান দেয়, যা পথচারী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে দারুণ উদ্দীপনা সৃষ্টি করে।

র‍্যালি শেষে উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে আয়োজিত আলোচনা সভায় বক্তারা বর্তমান যুগে সাক্ষরতার আধুনিক ধারণা ব্যাখ্যা করেন। তারা বলেন, এখনকার দিনে কেবল নিজের নাম দস্তখত করা কিংবা সাধারণ কিছু পড়তে পারাকেই পূর্ণাঙ্গ সাক্ষরতা বলা যায় না। প্রযুক্তির এই দ্রুত পরিবর্তনের যুগে ডিজিটাল ডিভাইসের ব্যবহার জানা, সামাজিক মাধ্যমে সঠিক তথ্য যাচাই করার ক্ষমতা, পরিবেশ সচেতনতা এবং কর্মমুখী কারিগরি দক্ষতাই হলো আসল সাক্ষরতা। বাস্তব জীবনের সমস্যার সমাধান এবং আয়-রোজগারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সমাজের সবাইকে আধুনিক শিক্ষার আওতায় নিয়ে আসাই এখন বড় কাজ।

অনুষ্ঠানে দেশের সাক্ষরতার অগ্রগতি তুলে ধরে বক্তারা বলেন, স্বাধীনতার পর দেশের সাক্ষরতার হার ছিল মাত্র ২৫% থেকে ৩০% এর কাছাকাছি। তবে ধারাবাহিক প্রচেষ্টার ফলে বর্তমানে বাংলাদেশে ৭ বছর ও তদূর্ধ্ব জনগোষ্ঠীর সাক্ষরতার হার বেড়ে ৭৭.৯% বা প্রায় ৭৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। তবে এখনও দেশের প্রায় ২২% মানুষ সাক্ষরতার ছোঁয়া পাননি। বিশেষ করে প্রত্যন্ত গ্রাম ও দরিদ্র পরিবারের মানুষেরা এখনও পিছিয়ে রয়েছেন। যেসব পরিবারের আয় দিনে মাত্র $২ থেকে $৩ ডলার, তারা দারিদ্র্যের চাপে সন্তানদের নিয়মিত স্কুলে পাঠাতে পারেন না। ফলে প্রায় ১৫% থেকে ২০% শিক্ষার্থী প্রাথমিক শেষ করার আগেই ঝরে পড়ে। এই ঝরে পড়ার হার শূন্যে নামিয়ে আনতে প্রশাসনের কঠোর পদক্ষেপ প্রয়োজন।

সভায় আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট ও ইতিহাসের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বক্তারা জানান, জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থা (ইউনেস্কো) ১৯৬৬ সালে ৮ সেপ্টেম্বরকে আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস হিসেবে ঘোষণা করেছিল। পরের বছর অর্থাৎ ১৯৬৭ সাল থেকে বিশ্বব্যাপী এই দিবসটি নিয়মিত পালিত হয়ে আসছে। ২০২৬ সালে দিবসটি পালনের ঐতিহাসিক ৬০ বছর পূর্ণ হলো। এই ছয় দশকে বিশ্বব্যাপী শিক্ষার প্রসার ঘটলেও ইউনেস্কোর তথ্যমতে, সারা বিশ্বে এখনও অন্তত ৭৫০ মিলিয়নের বেশি প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ প্রাথমিক অক্ষরজ্ঞান থেকে বঞ্চিত।

স্থানীয় প্রশাসনিক কর্মকর্তারা বলেন, শৈলকুপার প্রত্যন্ত এলাকাগুলোতে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ আরও বাড়ানো হবে। যেসব কিশোর-কিশোরী অভাবের কারণে পড়াশোনা ছেড়ে কাজে যোগ দিতে বাধ্য হয়েছে, তাদের কাজের পাশাপাশি উপানুষ্ঠানিক ক্লাসে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। সভায় উপস্থিত শিক্ষক ও সমাজকর্মীরা বাল্যবিয়ে রোধ এবং শিশুশ্রম বন্ধের জোর দাবি জানান। বক্তারা বলেন, বাল্যবিয়ে পুরোপুরি বন্ধ করতে পারলে মেয়েদের শিক্ষার হার আরও অন্তত ১০% বাড়ানো সম্ভব হবে।

শৈলকুপার এই উৎসবমুখর আয়োজনের মধ্য দিয়ে একটি দক্ষ, সচেতন এবং আধুনিক সমাজ গঠনের দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়। অনুষ্ঠানে উপস্থিত সচেতন নাগরিকেরা প্রতিজ্ঞা করেন, শৈলকুপায় কোনো নিরক্ষর মানুষ থাকবে না। উপজেলা প্রশাসন স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, শৈলকুপাকে ১০০% নিরক্ষরমুক্ত ও দক্ষ জনপদে রূপান্তর করতে প্রতিটি ইউনিয়ন পর্যায়ে নিয়মিত তদারকি চলবে। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় একটি আলোকিত সমাজ গড়ে তোলাই এই দিবসের মূল লক্ষ্য।

সম্পর্কিত নিবন্ধ