জুলাই ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত গণহত্যার দায়ে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ শীর্ষ অপরাধীদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার আইনি রূপরেখা তৈরির কাজ দ্রুতগতিতে এগোচ্ছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আগেই শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের ফাঁসির রায়ের পাশাপাশি তাঁদের সব স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ বাজেয়াপ্তের নির্দেশ দিয়েছেন। ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, কোন সংস্থা এই সম্পদ বাজেয়াপ্ত করবে এবং শহীদ পরিবারগুলোকে তা কীভাবে দেওয়া হবে, সে বিষয়ে সুস্পষ্ট বিধিমালা তৈরি করা হচ্ছে। প্রক্রিয়া চূড়ান্ত হলে আগের রায় অনুযায়ী এই আদেশ কার্যকর করা হবে।
চিফ প্রসিকিউটরের মতে, বিদ্যমান সাধারণ আইন ও ট্রাইব্যুনালের বিধিতে সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার স্পষ্ট বিধান রয়েছে। আইনি কাঠামো পুরোপুরি প্রস্তুত হলে এর ওপর ‘রেট্রোস্পেকটিভ ইফেক্ট’ বা অতীতমুখী কার্যকারিতা প্রযোজ্য হবে। ফলে রায় ঘোষণার দিন থেকেই সম্পত্তি সরকারের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পথে কোনো আইনি বাধা থাকবে না। সরকারের মূল লক্ষ্য হলো বাজেয়াপ্ত সম্পদ থেকে অর্থ সংগ্রহ করে জুলাই বিপ্লবে নিহতদের শহীদ পরিবার ও আহতদের অন্তত ১০০% পুনর্বাসন ও উপযুক্ত আর্থিক অনুদান নিশ্চিত করা। তবে সাধারণ মানুষের মনে এখন বড় প্রশ্ন, শেখ হাসিনার নামে আসলে কী পরিমাণ সম্পদ রয়েছে?
২০২৪ সালের দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের হলফনামা অনুযায়ী, শেখ হাসিনা নিজের নামে মোট ৪ কোটি ৩৪ লাখ টাকার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের হিসাব দিয়েছিলেন, যা আন্তর্জাতিক মুদ্রায় প্রায় ৩ লাখ ৬০ হাজার মার্কিন ডলার ($)। তখন তিনি নিজের হাতে নগদ সাড়ে ২৮ হাজার টাকা এবং ব্যাংক ও বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ২ কোটি ৩৯ লাখ টাকা জমা দেখান। এর বাইরে তাঁর ছিল ৫৫ লাখ টাকার এফডিআর এবং ২৫ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র। এছাড়া তিনি সোনা ও অলংকার বাবদ ১৩ লাখ ২৫ হাজার টাকা, আসবাবপত্র বাবদ ৭ লাখ ৪০ হাজার টাকা এবং দুটি মোটরগাড়ির দাম সাড়ে ৪৭ লাখ টাকা উল্লেখ করেছিলেন।
জমিজমার হিসাবে শেখ হাসিনা টুঙ্গিপাড়া, গোপালগঞ্জ সদর, গাজীপুর ও রংপুরে মোট ১৫ দশমিক ৩ বিঘা কৃষিজমি থাকার কথা জানান। এর বাইরে ঢাকার পূর্বাচলে তাঁর নামে ১০ কাঠার একটি রাজউক প্লট রয়েছে, যার তৎকালীন মূল্য দেখানো হয়েছিল ৩৪ লাখ ৭৬ হাজার টাকা। ক্ষমতা থাকাকালে তিনি নিজের পরিবার ও স্বজনদের মধ্যে প্রভাব খাটিয়ে মোট ৬০ কাঠা সরকারি প্লট বরাদ্দ নিয়েছিলেন, যা নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তদন্ত চালাচ্ছে। এছাড়া গাজীপুরের মৌচাকে মহাসড়ক সংলগ্ন শেখ পরিবারের ২৯৭ শতক বা প্রায় ৯ বিঘা আয়তনের একটি বিলাসবহুল বাগানবাড়ি এবং টুঙ্গিপাড়ায় তিনতলা ভবনসহ জমি রয়েছে।
হলফনামার বাইরে শেখ হাসিনার বিপুল পরিমাণ গোপন সম্পদের খোঁজ পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন। সংস্থাটির তদন্তে উঠে এসেছে, ২০০৮ সালের নবম সংসদ নির্বাচনে শেখ হাসিনা নিজ নামে মাত্র ৬ দশমিক ৫০ একর জমি দেখিয়েছিলেন। অথচ দুদকের অনুসন্ধানে তাঁর নামে প্রকৃতপক্ষে ২৮ একর ৪১ শতকেরও বেশি স্থাবর সম্পত্তির সন্ধান মেলে। অর্থাৎ তিনি হলফনামায় তাঁর মোট সম্পদের প্রায় ৩০০% এর বেশি সম্পদ অসৎ উদ্দেশ্যে গোপন করেছিলেন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই বেনামি ও অপ্রদর্শিত সব জমিও বাজেয়াপ্তের তালিকায় যুক্ত করতে কাজ করছে রাষ্ট্রপক্ষ।
তবে ঐতিহাসিক ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাড়ি এবং ধানমন্ডির সুধা সদন সরাসরি শেখ হাসিনার নামে নেই বলে ভূমি রেকর্ড থেকে জানা গেছে। ৩২ নম্বরের বাড়িটির বর্তমান আইনি মালিকানা ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেমোরিয়াল ট্রাস্ট’-এর অধীনে রয়েছে। অন্যদিকে শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত বাসভবন হিসেবে পরিচিত সুধা সদনের মালিকানা রয়েছে তাঁর দুই সন্তান সজীব ওয়াজেদ জয় ও সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের নামে। আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ট্রাস্ট বা সন্তানদের নামে থাকা সম্পত্তির বৈধতা খতিয়ে দেখে পরবর্তী ব্যবস্থা নেবে আদালত।
শেখ হাসিনার পাশাপাশি সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এবং আশুলিয়ায় ৬ জনের লাশ পোড়ানোর মামলার আসামি সাবেক এমপি সাইফুল ইসলামের সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের নির্দেশও বহাল রয়েছে। ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি গোলাম মর্তূজা মজুমদার তাঁর রায়ে জুলাই শহীদদের পরিবারকে উল্লেখযোগ্য ক্ষতিপূরণ দিতে সরকারকে নির্দেশ দিয়েছেন। শহীদ পরিবারগুলোর দাবি, অবিলম্বে ঘাতকদের দেশ-বিদেশের সব সম্পদ বিক্রি করে দ্রুত শহীদ ও আহত পরিবারের পুনর্বাসন নিশ্চিত করতে হবে।
















