ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলার বগুড়া ইউনিয়নের প্রত্যন্ত দলিলপুর গ্রামে দুই পক্ষের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ বা স্থানীয় ভাষায় ‘কাইজার’ ঘটনায় পুলিশ বিশেষ সাঁড়াশি অভিযান চালিয়েছে। গত ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখ গ্রামের সামাজিক বিরোধ ও পুরনো শত্রুতাকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষ তুমুল সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। এ ঘটনার পর উভয় পক্ষই শৈলকুপা থানায় পরস্পরের বিরুদ্ধে দুটি পৃথক এজাহার দায়ের করে। এর পরিপ্রেক্ষিতে শৈলকুপা থানার অফিসার ফোর্স অভিযান পরিচালনা করে ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখ দলিলপুর গ্রাম থেকে দুই পক্ষের মোট ১৫ জন এজাহারনামীয় আসামিকে গ্রেপ্তার করে।
স্থানীয় সূত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ৫ সেপ্টেম্বর দলিলপুর গ্রামে দীর্ঘদিনের সামাজিক আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা দেখা দেয়। একপর্যায়ে দেশীয় ঢাল, বল্লম, লাঠিসোটা ও ইটপাটকেল নিয়ে উভয় পক্ষ রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। এ সময় পুরো এলাকায় চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং গ্রামের প্রায় ৮০% দোকানপাট মুহূর্তেই বন্ধ হয়ে যায়। সংঘর্ষ চলাকালে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও বাড়িঘর ভাঙচুরে উভয় পক্ষের বেশ কয়েকজন আহত হন। গ্রামবাসীর হিসাব অনুযায়ী, সংঘর্ষে অন্তত $৫০০ ডলার বা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৬০ হাজার টাকার গ্রামীণ সম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
ঘটনার পর গ্রামে পুনরায় বিশৃঙ্খলার আশঙ্কায় উভয় পক্ষই আইনের আশ্রয় নেয়। উভয় পক্ষের প্রতিনিধিরা থানায় উপস্থিত হয়ে পাল্টাপাল্টি এজাহার জমা দিলে পুলিশ দুটি পৃথক নিয়মিত মামলা দায়ের করে। এর মধ্যে একটি শৈলকুপা থানার মামলা নং-০৬(৯)২৬ এবং অপরটি শৈলকুপা থানার মামলা নং-০৭(৯)২৬ হিসেবে রেকর্ডভুক্ত হয়। মামলা দুটি নথিভুক্ত হওয়ার পরপরই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার নির্দেশে এলাকায় শান্তি বজায় রাখতে এবং সন্ত্রাসীদের ধরতে পুলিশের একাধিক বিশেষ দল গঠন করা হয়। পুলিশ কোনো পক্ষকেই ছাড় না দেওয়ার স্পষ্ট বার্তা দেয়।
মামলা রেকর্ডের পর শৈলকুপা থানার অফিসার ফোর্স দলিলপুর গ্রামে অভিযান পরিচালনা করে প্রথম পক্ষের মামলা নং-০৬(৯)২৬-এর এজাহারনামীয় ৯ জন আসামিকে গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন—দলিলপুর গ্রামের মৃত ময়েন উদ্দিন শেখের ছেলে মোঃ আতিয়ার শেখ (৬০), তোফাজ্জেল শেখ ওরফে তুফার ছেলে মোঃ সাজ্জাদ শেখ (৩৫), মোঃ আলী আকবর শেখের ছেলে মোঃ শাহিন শেখ (৪০), মোঃ জামাল উদ্দিন কারীকরের ছেলে মোঃ আজিজুল হাকিম (২৪), লতিফ মোল্লার ছেলে মোঃ হাফিজ মোল্লা (৩৭), আব্দুল আজিজের ছেলে মোঃ সাহেব আলী (৫৫), ইমারত জোয়ার্দ্দারের ছেলে মোঃ রাজিব আহম্মেদ (২২), বিকুল জোয়ার্দ্দারের ছেলে মোঃ আমিন জোয়ার্দ্দার (২৩) এবং আতর আলী জোয়ার্দ্দারের ছেলে মোঃ সাজ্জাদ জোয়ার্দ্দার (৬২)।
একই অভিযানে শৈলকুপা থানার পুলিশ সদস্যরা দ্বিতীয় পক্ষের মামলা নং-০৭(৯)২৬-এর এজাহারভুক্ত আরও ৬ জন আসামিকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হন। গ্রেপ্তার আসামিরা হলেন—দলিলপুর গ্রামের মোঃ গোলাম মন্ডলের ছেলে মোঃ জসিম মন্ডল (২৮), রেজাউল বিশ্বাসের ছেলে আকরাম বিশ্বাস (২৭), মোহাম্মাদ আলী গাজীর ছেলে মোঃ শাকিল গাজী (২৪), মৃত গফুর শেখের ছেলে মোঃ আব্দুল লতিফ (৬৫), মৃত ইমান আলী ওরফে ইসমাইল মন্ডলের ছেলে নায়েব আলী মন্ডল (৩৯) এবং মোঃ আরব আলী শেখের ছেলে ইমদাদ শেখ (২৯)। পুলিশ জানায়, গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিরা সংঘর্ষের সময় সরাসরি নেতৃত্ব দেওয়া ও হামলায় লিপ্ত ছিলেন।
অভিযানের বিষয়ে শৈলকুপা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোঃ হুমায়ূন কবির মোল্লা জানান, দলিলপুর গ্রামে কাইজার খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করে। এরপর প্রাপ্ত এজাহারের ভিত্তিতে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে আসামিদের চিহ্নিত করা হয়। গ্রেপ্তার হওয়া এই ১৫ জন আসামিকে কোনো প্রকার ছাড় দেওয়া হয়নি। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ শেষে রোববার বিধি মোতাবেক তাদের বিজ্ঞ আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে। বিজ্ঞ আদালত পরবর্তী আইনি কার্যক্রমের জন্য আসামিদের জেলা কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন।
ওসি মোঃ হুমায়ূন কবির মোল্লা আরও উল্লেখ করেন, এলাকায় কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা বরদাশত করা হবে না এবং এ বিষয়ে পুলিশ প্রশাসন ১০০% কঠোর অবস্থানে রয়েছে। গ্রামে নতুন করে উত্তেজনা এড়াতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে এবং নিয়মিত টহল বাড়ানো হয়েছে। বর্তমানে দলিলপুর গ্রামের সামগ্রিক পরিস্থিতি পুলিশের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এ ছাড়া ঘটনায় জড়িত পলাতক থাকা বাকি আসামিদের দ্রুত আইনের আওতায় আনতে পুলিশি অভিযান অব্যাহত রয়েছে। তিনি এলাকার শান্তি রক্ষায় স্থানীয় সবাইকে গুজবে কান না দিয়ে সচেতন থাকার আহ্বান জানান।
















