যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আবারও ইরানের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক কেন্দ্র ‘পিকঅ্যাক্স’ পর্বতে সরাসরি সামরিক হামলা চালানোর কড়া হুমকি দিয়েছেন। শুক্রবার ওয়াশিংটনের ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তিনি জানান, মার্কিন বাহিনী খুব শিগগিরই পাহাড়টির নিচে গড়ে তোলা ইরানের এই পারমাণবিক ঘাঁটিতে নতুন করে আঘাত হানতে পারে। ট্রাম্পের এমন সরাসরি হুঁশিয়ারিতে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার উত্তেজনা নতুন মাত্রা পেয়েছে এবং পুরো মধ্যপ্রাচ্যে বড় আকারের যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার গভীর আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
ইরানের ইস্পাহান প্রদেশে অবস্থিত এই বিশেষ পাহাড়ি স্থাপনার স্থানীয় নাম ‘কুহ-ই কোলাং গাজলা’। রাজধানী তেহরান থেকে প্রায় ২২০ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত পিকঅ্যাক্স পর্বত দেশটির অন্যতম প্রধান পারমাণবিক কেন্দ্র নাতাঞ্জ থেকে মাত্র ২ কিলোমিটার দূরে। মার্কিন গোয়েন্দা নথির তথ্য অনুযায়ী, নিরেট ও অত্যন্ত শক্ত গ্রানাইট পাথরের কয়েক শ মিটার নিচে বিশাল সুড়ঙ্গ খুঁড়ে এই স্থাপনা তৈরি করেছে তেহরান। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, পারমাণবিক গবেষণার মূল নিয়ন্ত্রণ কক্ষগুলো পাহাড়ের উপরিভাগ থেকে অন্তত ১০০ মিটার গভীরে সুরক্ষিত রয়েছে, যাতে শক্তিশালী বাংকার বিধ্বংসী বোমায় এর কোনো ক্ষতি না হয়।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক স্যাটেলাইট নজরদারি সংস্থা ইনস্টিটিউট ফর সায়েন্স অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল সিকিউরিটির তথ্যমতে, পিকঅ্যাক্স পর্বতের ভেতরে পারমাণবিক কার্যক্রম এখনো পুরোদমে চালু হয়নি। তবে পশ্চিমা সামরিক বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েল তাদের পরিচিত স্থাপনাগুলোতে হামলা করতে পারে—এমন আশঙ্কা থেকেই মূলত ইরান এই অঘোষিত ও দুর্ভেদ্য ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্রটি বানিয়েছে। তবে ইরান সব সময় জোর দিয়ে বলে আসছে যে তাদের এই কর্মসূচি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ। পারমাণবিক অস্ত্র বা বিধ্বংসী বোমা তৈরির কোনো গোপন পরিকল্পনা তাদের নেই।
বর্তমান পরিস্থিতিতে পিকঅ্যাক্স পর্বতের সামরিক গুরুত্ব বাড়ার মূল কারণ হলো এর অক্ষত অবস্থা। ২০২৫ সালের জুনে যুক্তরাষ্ট্র যখন ফোর্দো, নাতাঞ্জ ও ইস্পাহানের কেন্দ্রগুলোতে তীব্র বিমান হামলা চালিয়েছিল, তখন পিকঅ্যাক্স পাহাড়ের কোনো বড় ক্ষতি হয়নি। স্যাটেলাইটের ছবিতে দেখা যায়, শুধু বাইরে খনন করা মাটি ও পাথরের স্তূপের কাছে রাখা একটি সাধারণ গাড়ি ধ্বংস হয়েছিল। চলমান অস্থিরতায় ইরানের অন্য অবকাঠামোগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় পরমাণু কর্মসূচি পুনর্গঠনের জন্য তারা এখন এই পাহাড়ের ভেতরের সুড়ঙ্গগুলোকেই প্রধান ভরসা হিসেবে বেছে নিচ্ছে। বিশ্লেষকদের ধারণা, সেখানেই এখন সেন্ট্রিফিউজ তৈরি ও সংযোজনের কাজ চলছে।
ইউরোপিয়ান কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস জানিয়েছে, ২০২৫ সালের জুনের হামলায় নাতাঞ্জ ও ফোর্দোতে সচল থাকা প্রায় ১৮,০০০ সেন্ট্রিফিউজের বড় অংশই ধ্বংস হয়ে যায়। সেন্ট্রিফিউজ তৈরির প্রধান কারখানাগুলোও বোমা হামলায় তছনছ হয়ে গিয়েছিল। তবে সে সময় প্রায় ৪,০০০ নতুন সেন্ট্রিফিউজ গুদামে বসানো থাকলেও সেগুলো চালু করা হয়নি। মার্কিন সংবাদপত্র দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জুলাইয়ের এক প্রতিবেদনে জানায়, ইরান গত বছরের শেষ দিকে হাজার হাজার সেন্ট্রিফিউজ এই পিকঅ্যাক্স পর্বতের ভেতরে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নিয়েছে। যদিও পেন্টাগন এ তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেনি।
বর্তমানে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা বা আইএইএ-এর পরিদর্শকেরা ইরানে বোমায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া কেন্দ্রগুলোতে ঢুকতে পারছেন না। ফলে দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচির বর্তমান অবস্থা স্পষ্ট নয়। গোয়েন্দাদের হিসাবমতে, ইরানের কাছে এখন প্রায় ৪৪০ কেজি ৬০% সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুদ রয়েছে। সামরিক কাজে ব্যবহারযোগ্য পারমাণবিক বোমা তৈরির জন্য এই উপাদানকে অন্তত ৯০% পর্যন্ত সমৃদ্ধ করতে হবে। কিন্তু সেই জটিল কাজের জন্য প্রয়োজনীয় আধুনিক সেন্ট্রিফিউজগুলোর কতটা এখনো অক্ষত রয়েছে, তা নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না।
এর আগে ট্রাম্প দাবি করেছিলেন যে তাঁর হামলায় ইরানের পারমাণবিক কেন্দ্রগুলো ‘শতভাগ ধ্বংস’ হয়েছে। কিন্তু পরে মার্কিন প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থার ফাঁস হওয়া প্রতিবেদনে দেখা যায়, স্থাপনাগুলো মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হলেও একেবারে নিশ্চিহ্ন হয়নি। জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নাদের হাশেমি আল-জাজিরাকে জানান, আগের দুই দফা হামলায় ইরানের কতটা ক্ষতি হয়েছে তা পরিষ্কার না হওয়ায় পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে ধোঁয়াশা রয়েই গেছে। এদিকে পরমাণু সমঝোতা নিয়ে দুই পক্ষের ৬০ দিনের সময়সীমা গত আগস্টেই কোনো চুক্তি ছাড়া শেষ হয়ে গেছে। ফলে পিকঅ্যাক্স পাহাড়ে ট্রাম্পের নতুন হুমকি ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতকে আরও এক ধাপ যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিল।
















