মানবিক কোটচাঁদপুর: শহরের পথে পথে অসহায় ও ভবঘুরেদের মুখে খাবার তুলে দিল ‘এবিএফ’

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

রোকনুজ্জামান, কোটচাঁদপুর (ঝিনাইদহ):

শনিবারের তপ্ত দুপুরে যখন সাধারণ মানুষ ঘরের কোণে বিশ্রামে ব্যস্ত, ঠিক তখনই ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুর শহরের রাস্তায় দেখা গেল এক অন্যরকম মানবিক দৃশ্য। সমাজের সবচেয়ে অবহেলিত ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষ, যাদের দিন কাটে অনাহারে বা অর্ধাহারে, তাদের মুখে হাসি ফোটাতে এগিয়ে এসেছে মানবাধিকার সংস্থা ‘অধিকার বাস্তবায়ন ফাউন্ডেশন’ (এবিএফ)। শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) দুপুরে সংগঠনটির উদ্যোগে শহরের বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে ঘুরে অসহায়, ভবঘুরে ও ভিক্ষুকদের মাঝে উন্নত মানের রান্না করা খাবার বিতরণ করা হয়। এই মানবিক আয়োজনে শহরের রেলস্টেশন থেকে শুরু করে বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত প্রতিটি মোড়ে মোড়ে থাকা ক্ষুধার্ত মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয় ভালোবাসার উপহার।

সংগঠনটির সদস্যরা দুপুর ১২টার পর থেকেই শহরের প্রধান বাজার এলাকা থেকে এই কর্মসূচি শুরু করেন। এরপর তারা একে একে বাসস্ট্যান্ড এবং রেলস্টেশন এলাকায় যান। সেখানে ছন্নছাড়া হয়ে পড়ে থাকা ভবঘুরে এবং ভিক্ষুকদের খুঁজে বের করে তাদের হাতে খাবারের প্যাকেট তুলে দেন। অনেক বৃদ্ধ ভিক্ষুক খাবারের প্যাকেট হাতে পেয়ে আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়েন। আয়োজকরা জানান, বর্তমান বাজারে যেখানে খাবারের দাম আকাশচুম্বী, সেখানে একবেলা পেট ভরে খাওয়ার সুযোগ পাওয়া এই মানুষগুলোর জন্য বিশাল এক আনন্দের ব্যাপার। তারা শহরের প্রায় ১০০% এলাকা ঘুরে ঘুরে প্রকৃত অভাবী মানুষদের চিহ্নিত করার চেষ্টা করেছেন যাতে কোনো ক্ষুধার্ত মানুষ বাদ না পড়ে।

এই মহতী কার্যক্রমে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কোটচাঁদপুর পৌরসভার সাবেক মেয়র ও বিশিষ্ট সমাজসেবক সালাউদ্দিন বুলবুল সিডল। তিনি ব্যক্তিগতভাবে প্রতিটি মানুষের হাতে খাবার তুলে দেন এবং তাদের কুশল বিনিময় করেন। এছাড়া সংগঠনের উপদেষ্টা ও ন্যাশনাল সার্ভে কোম্পানির চেয়ারম্যান মাজেদুল ইসলাম মিন্টু ঢালী এই পুরো প্রক্রিয়ায় সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। সাংবাদিকদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন অধিকার বাস্তবায়ন ফাউন্ডেশনের উপজেলা সভাপতি জাহাঙ্গীর আলম, সাধারণ সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান আপেল, এবং সহ-সভাপতি রেজাউল করিম রেজা। উপস্থিত সদস্যরা বলেন, সমাজের বিত্তবানরা যদি তাদের আয়ের মাত্র ১০% অংশ এই কাজে ব্যয় করেন, তবে দেশে একজন মানুষও না খেয়ে থাকবে না।

সাবেক মেয়র সালাউদ্দিন বুলবুল সিডল তার বক্তব্যে বলেন, “আমরা অনেক সময় অপ্রয়োজনীয় কাজে অনেক ডলার ($) বা টাকা খরচ করি। কিন্তু রাস্তার পাশে পড়ে থাকা এই মানুষগুলোর দিকে তাকানোর সময় আমাদের হয় না। অসহায় ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের পাশে দাঁড়ানো আমাদের নিছক দয়া নয়, বরং এটি আমাদের সামাজিক ও মানবিক দায়িত্ব। তিনি আরও বলেন, সমাজের সামর্থ্যবানরা যদি নিজ নিজ অবস্থান থেকে এগিয়ে আসেন, তবেই একটি সমৃদ্ধ ও ক্ষুধা মুক্ত সমাজ গড়া সম্ভব।” তিনি এবিএফ-এর এই উদ্যোগকে ১০০% সফল ও অনুকরণীয় বলে উল্লেখ করেন।

অধিকার বাস্তবায়ন ফাউন্ডেশনের কোটচাঁদপুর উপজেলা শাখার সভাপতি সাংবাদিক জাহাঙ্গীর আলম জানান, তাদের সংগঠনের মূল লক্ষ্যই হলো মানুষের মৌলিক অধিকারগুলো নিশ্চিত করা। ‘মানবাধিকার সুরক্ষা ও বাস্তবায়নে ঐক্যবদ্ধ হই’—এই প্রতিজ্ঞাকে সামনে রেখে তারা কাজ করে যাচ্ছেন। তিনি বলেন, “আমরা চাই না আমাদের শহরে কেউ অভুক্ত থাকুক। আজ আমরা প্রায় ১৫০ থেকে ২০০ মানুষের মুখে অন্ন তুলে দিতে পেরেছি। আগামীতে আমাদের এই সেবার পরিধি আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। সমাজের সাধারণ মানুষের কাছ থেকে প্রাপ্ত সহযোগিতার প্রতিটি পয়সা আমরা স্বচ্ছতার সাথে এই কাজে ব্যয় করছি।”

সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান আপেল বলেন, অনেক সময় ভিক্ষুকরা সারাদিন ঘুরেও ২০ থেকে ৫০ টাকার বেশি আয় করতে পারে না, যা দিয়ে বর্তমান সময়ে একবেলা খাওয়াও অসম্ভব। আমরা চেষ্টা করছি তাদের এই কষ্টের মুহূর্তে কিছুটা স্বস্তি দিতে। এই কাজে সাংগঠনিক সম্পাদক মামুন হোসেন, প্রচার সম্পাদক মশিয়ার রহমান এবং অর্থ সম্পাদক আব্দুল হামিদ তুহিনসহ ১০-১২ জন সদস্য নিরলস পরিশ্রম করেছেন। তারা শহরের আনাচে-কানাচে থাকা প্রতিটি অসহায় মানুষের খোঁজ নিয়েছেন। তাদের এই কার্যক্রম দেখে স্থানীয় অনেক পথচারীও উদ্বুদ্ধ হয়েছেন এবং অনেকে ভবিষ্যতে আর্থিক সাহায্য করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

খাবার বিতরণের সময় রেলস্টেশনে অবস্থানরত এক বৃদ্ধা বলেন, “বাবা, আজ সকাল থেকে কিছু খাইনি। তোমাদের এই খাবার আমার জন্য আশীর্বাদের মতো।” এমন অনেক মানুষের দোয়া ও ভালোবাসা সংগঠনটিকে ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে কাজ করার সাহস দিচ্ছে। অধিকার বাস্তবায়ন ফাউন্ডেশনের নেতৃবৃন্দ জানান, তারা কেবল খাবার বিতরণেই সীমাবদ্ধ থাকতে চান না, বরং এই মানুষগুলোর স্থায়ী পুনর্বাসনের জন্যও সরকারের কাছে দাবি জানাবেন। দেশের দরিদ্র সীমার নিচে থাকা ১০% থেকে ১৫% মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন না করলে সামগ্রিক উন্নয়ন সম্ভব নয় বলে তারা মনে করেন।

পরিশেষে, অনুষ্ঠানটি সফলভাবে সম্পন্ন হওয়ায় আয়োজকরা সংশ্লিষ্ট সকলকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। কোটচাঁদপুর শহরের সাধারণ মানুষ এবং ব্যবসায়ীরাও এই কার্যক্রমের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। তারা মনে করেন, এ ধরনের সামাজিক কার্যক্রম সমাজের অস্থিরতা কমিয়ে মানুষের মধ্যে ভ্রাতৃত্ববোধ জাগ্রত করে। মানবাধিকার সংস্থা এবিএফ প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যে, তারা কেবল বিশেষ দিনেই নয়, বরং নিয়মিত বিরতিতে এমন সেবামূলক কাজ চালিয়ে যাবে। তাদের এই উদ্যোগ স্থানীয় তরুণ প্রজন্মের কাছে একটি বড় অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করবে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ