শিশুদের ফুটবল খেলা নিয়ে বিরোধ: মহেশপুরে ভাগ্নি জামাইয়ের লাঠির আঘাতে মামাশ্বশুর নিহত

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

ঝিনাইদহের মহেশপুরে তুচ্ছ এক ঘটনাকে কেন্দ্র করে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে প্রাণ হারিয়েছেন রবিউল ইসলাম নামে এক ব্যক্তি। সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, এই হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে ছিল শিশুদের ফুটবল খেলা নিয়ে সামান্য কথা কাটাকাটি। শিশুদের সেই ঝগড়া বড়দের মাঝে ছড়িয়ে পড়ে এবং শেষ পর্যন্ত ভাগ্নি জামাইয়ের হাতে প্রাণ দিতে হলো মামাশ্বশুরকে। শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) দুপুর ১টার দিকে উপজেলার যাদবপুর বাজার সংলগ্ন এলাকায় এই মর্মান্তিক ঘটনাটি ঘটে। এই ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্য ও শোকের সৃষ্টি হয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের সাথে কথা বলে জানা যায়, শনিবার সকালে এলাকার একদল শিশু ফুটবল খেলছিল। খেলা চলাকালে দুই শিশুর মধ্যে ঝগড়া শুরু হয়। বিষয়টি নিয়ে প্রথমে দুই পরিবারের নারীদের মধ্যে কথা কাটাকাটি হয়। এক পর্যায়ে পুরুষরা সেখানে জড়িয়ে পড়লে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। রবিউল ইসলাম ও তার ভাগ্নি জামাই লুৎফর রহমানের পরিবারের মধ্যে চরম উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। শিশুদের এই সাধারণ বিরোধ যে ১০০% খুনে রূপ নেবে, তা গ্রামের সাধারণ মানুষ আগে থেকে আঁচ করতে পারেনি।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বাকবিতণ্ডার এক পর্যায়ে লুৎফর রহমান উত্তেজিত হয়ে একটি শক্ত লাঠি দিয়ে রবিউল ইসলামের পিঠে ও ঘাড়ে সজোরে আঘাত করেন। আঘাতটি এতটাই গুরুতর ছিল যে রবিউল সাথে সাথে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন এবং অচেতন হয়ে যান। পরিবারের সদস্যরা চিৎকার শুরু করলে প্রতিবেশীরা ছুটে আসেন। এরপর রক্তাক্ত অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে দ্রুত স্থানীয় যাদবপুর ক্লিনিকে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর পর কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। চিকিৎসকদের মতে, অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণের কারণে তার মৃত্যু হয়েছে।

এই ঘটনার পরপরই অভিযুক্ত লুৎফর রহমান এলাকা ছেড়ে পালিয়ে গেছেন। তাকে গ্রেফতার করতে পুলিশ ইতোমধ্যে অভিযান শুরু করেছে। মহেশপুর থানার সাব-ইন্সপেক্টর (এসআই) আব্দুর রাজ্জাক ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, পুলিশ খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। তিনি বলেন, তুচ্ছ একটি বিষয় নিয়ে এই হত্যাকাণ্ডটি ঘটেছে। নিহতের মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য ঝিনাইদহ সদর হাসপাতাল মর্গে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট এলে আঘাতের ধরন সম্পর্কে আরও বিস্তারিত জানা যাবে।

বর্তমানে মহেশপুর থানায় এ বিষয়ে একটি হত্যা মামলা দায়ের করার প্রস্তুতি চলছে। নিহতের পরিবারের সদস্যরা কান্নায় ভেঙে পড়েছেন। রবিউলের স্ত্রী ও সন্তানরা এই অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু মেনে নিতে পারছেন না। গ্রামের মানুষ বলছেন, লুৎফর ও রবিউল সম্পর্কে অত্যন্ত নিকট আত্মীয়। ভাগ্নি জামাই হয়ে এমন কাণ্ড ঘটানোয় পুরো গ্রামবাসী স্তম্ভিত। এলাকায় যেন আর কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে, সেজন্য অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। লুৎফরকে ধরতে পুলিশ ১০০% চেষ্টা চালাচ্ছে বলে আশ্বস্ত করেছেন এসআই আব্দুর রাজ্জাক।

সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, আজকাল মানুষের মধ্যে ধৈর্য এবং সহনশীলতা অনেক কমে গেছে। পারিবারিক কলহের কারণে দেশে প্রায় ২০% থেকে ৩০% সহিংসতা বাড়ছে। সামান্য ফুটবল খেলা বা ছোটখাটো বিষয় নিয়ে মানুষ একে অপরকে আঘাত করতে দ্বিধা করছে না। রবিউলের মৃত্যুতে তার পরিবার এখন অভিভাবকহীন হয়ে পড়ল। নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে ঘাতকের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানানো হয়েছে। লুৎফরের পলাতক থাকা নিয়ে এলাকাবাসী ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এবং দ্রুত তাকে আইনের আওতায় আনার দাবি তুলেছেন।

বর্তমানে বাজারে নিত্যপণ্যের দাম নিয়ে সাধারণ মানুষ যখন হিমশিম খাচ্ছে, তখন এমন অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু পরিবারগুলোকে মানসিকভাবে ১০০% ভেঙে দিচ্ছে। রবিউল ছিলেন তার পরিবারের অন্যতম অবলম্বন। তার মৃত্যুতে পরিবারের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, শিশুদের ঝগড়া মেটাতে মুরুব্বিদের আরও দায়িত্বশীল হওয়া প্রয়োজন ছিল। আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া যে কত বড় অপরাধ, এই ঘটনাটি তার একটি বড় প্রমাণ। পুলিশ জানিয়েছে, অভিযুক্তের অবস্থান শনাক্ত করতে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে।

পরিশেষে, ময়নাতদন্ত শেষ হওয়ার পর রবিউলের মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে। পরিবারের সদস্যরা বিচারের দাবিতে অটল রয়েছেন। মহেশপুর থানা পুলিশ জানিয়েছে, তারা এই মামলাটিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করছে। কোনো অপরাধীই আইনের ঊর্ধ্বে নয় এবং দ্রুততম সময়ে দোষীকে বিচারের মুখোমুখি করা হবে। আজকের এই ঘটনা ঝিনাইদহের সাধারণ মানুষের মনে এক দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত রেখে গেল।

সম্পর্কিত নিবন্ধ