ঝিনাইদহের শৈলকুপায় সাধারণ ফসলের আড়ালে নিষিদ্ধ গাঁজা চাষের এক চাঞ্চল্যকর ঘটনা ফাঁস হয়েছে। শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬) গোপন সংবাদের ভিত্তিতে শৈলকুপা থানা পুলিশ বোয়ালিয়া গ্রামের একটি ফসলি মাঠে অভিযান চালিয়ে বড় আকৃতির দুটি গাঁজার গাছ উদ্ধার করে। এসময় এই অবৈধ চাষাবাদের সাথে সরাসরি জড়িত থাকার অভিযোগে মোঃ রেজাউল ইসলাম শেখ নামের এক ব্যক্তিকে পুলিশ হাতেনাতে গ্রেফতার করে। পুলিশের এই ঝটিকা অভিযানে এলাকায় রীতিমতো তোলপাড় শুরু হয়েছে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বস্তি ফিরে এসেছে।
গ্রেফতারকৃত রেজাউল ইসলাম শেখ (৫৫) ওই গ্রামের মৃত নিয়ত আলী শেখের ছেলে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, রেজাউল অনেকদিন ধরেই নিজের জমিতে বিভিন্ন শাক-সবজি ফলানোর পাশাপাশি গোপনে নিষিদ্ধ এই নেশাদ্রব্যের চাষ করছিলেন। মাঠের এক কোণায় ঝোপঝাড়ের আড়ালে তিনি এই গাছগুলো বড় করেন যাতে কারো চোখে না পড়ে। পুলিশ যখন সেখানে অভিযানে যায়, তখন রেজাউল নিজের জমিতেই কাজ করছিলেন। পালানোর কোনো সুযোগ না দিয়ে শৈলকুপা থানার একটি চৌকস অফিসার ফোর্স তাকে চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলে।
তদন্তে জানা গেছে, শৈলকুপার ৫নং কাচেরকোল ইউনিয়নের বোয়ালিয়া মধ্যপাড়া এলাকায় এই নিষিদ্ধ চাষাবাদ চলত। রেজাউল তার নিজের ভোগদখলীয় জমিতে দুটি গাঁজার গাছ বড় করেছিলেন। গাছগুলোর ডালপালা এবং উচ্চতা দেখে পুলিশ ধারণা করছে, এগুলো গত কয়েক মাস ধরে অত্যন্ত নিবিড় পরিচর্যায় বড় করা হয়েছে। বর্তমানে মাদক ব্যবসায়ীরা অপরাধ করার জন্য ১০০% নতুন নতুন কৌশল অবলম্বন করছে। অনেক সময় সাধারণ ফসলের ভেতরে এমনভাবে এই গাছ লাগানো হয় যা ৯৯% মানুষের নজরে পড়ে না। তবে পুলিশের গোয়েন্দা নজরদারির কারণে এই অপরাধটি শেষ পর্যন্ত ধরা পড়ল।
শৈলকুপা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোঃ হুমায়ূন কবির মোল্লা এই পুরো অভিযানটি সরাসরি তদারকি করেন। তিনি জানান, মাদকের বিরুদ্ধে প্রশাসনের জিরো টলারেন্স নীতি ১০০% বজায় রয়েছে। ওসি বলেন, “আমরা খবর পেয়েছিলাম যে বোয়ালিয়া মাঠে গোপনে নেশার গাছ লাগানো হয়েছে। খবর পাওয়ামাত্রই আমরা ফোর্স পাঠাই এবং প্রমাণসহ আসামিকে ধরি।” উদ্ধারকৃত গাছগুলো থেকে প্রচুর পরিমাণে শুকনা গাঁজা তৈরি করা সম্ভব ছিল, যার বাজারমূল্য কয়েক হাজার টাকা। তবে এর সামাজিক ক্ষতি ছিল অনেক বেশি। এলাকায় তরুণদের মধ্যে প্রায় ২০% থেকে ৩০% মাদকের দিকে ঝুঁকছে, যা সমাজের জন্য বড় বিপদ।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন অনুযায়ী রেজাউলের বিরুদ্ধে শৈলকুপা থানায় একটি নিয়মিত মামলা দায়ের করা হয়েছে। পুলিশ আরও খতিয়ে দেখছে যে এই চাষাবাদের পেছনে অন্য কোনো বড় সিন্ডিকেট জড়িত আছে কি না। নেশাজাতীয় এই দ্রব্যগুলো বিক্রির জন্য রেজাউল স্থানীয় ছোট মাদক বিক্রেতাদের সাথে যোগাযোগ রাখতেন। অনেক সময় এই মাদকগুলো প্রতি ১০০ গ্রাম হিসেবে চড়া দামে বিক্রি করা হয়। গ্রামের সাধারণ মানুষকে ধোঁকা দিয়ে রেজাউল এই অবৈধ কারবার চালিয়ে আসছিলেন। পুলিশ বলছে, এই গাছগুলো পূর্ণবয়স্ক হয়ে গেলে সেগুলো কেটে বাজারে ছাড়ার পরিকল্পনা ছিল তার।
স্থানীয় সাধারণ মানুষ বলছেন, শৈলকুপার প্রত্যন্ত অঞ্চলে মাদকের বিস্তার দিন দিন বাড়ছে। রেজাউলের মতো সাধারণ চাষিরা যখন ১০% বা ২০% বাড়তি মুনাফার লোভে এমন মরণনেশার চাষ করেন, তখন পুরো সমাজ ধ্বংসের মুখে পড়ে। পুলিশ মনে করছে, শুধু গ্রেফতার করে মাদক পুরোপুরি বন্ধ করা কঠিন, এর জন্য স্থানীয় জনগণের ১০০% সচেতনতা ও সহযোগিতা প্রয়োজন। এই অভিযানের পর গ্রামের মুরুব্বিরা দাবি করেছেন যেন নিয়মিত এই মাঠগুলোতে তল্লাশি চালানো হয় যাতে আর কেউ এমন সাহস না পায়।
বর্তমানে আসামী রেজাউলকে আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে পাঠানোর প্রক্রিয়া শেষ করেছে পুলিশ। শৈলকুপা থানা পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, প্রতিটি ইউনিয়নের মাঠ ও বাগানে তাদের নজরদারি আগের চেয়ে অনেক বেশি বাড়ানো হয়েছে। অপরাধীরা ধরা ছোঁয়ার বাইরে থাকার জন্য অনেক সময় ডিজিটাল ট্রানজেকশন বা মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবহার করে মাদকের টাকা লেনদেন করে। পুলিশ সেই সব মোবাইল নম্বরও ট্র্যাকিং করছে। এই ধরনের মাদকবিরোধী অভিযান ভবিষ্যতেও ১০০% সফলতার সাথে অব্যাহত থাকবে বলে ওসি নিশ্চিত করেছেন।
ঝিনাইদহ জেলার উর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তারাও এই সফল অভিযানের প্রশংসা করেছেন। মাদক মুক্ত সমাজ গড়তে হলে প্রতিটি গ্রাম থেকে তথ্য দিয়ে পুলিশকে সাহায্য করতে হবে। শৈলকুপা থানার এই তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা প্রমাণ করে যে অপরাধীরা যতই শক্তিশালী বা চতুর হোক না কেন, আইনের হাত থেকে তারা নিস্তার পাবে না। এই অভিযানের ফলে ওই এলাকায় মাদকের সরবরাহ অন্তত ১০% হলেও কমবে বলে আশা করা হচ্ছে। শৈলকুপা পুলিশ এখন এই চক্রের বাকি সদস্যদের ধরার জন্য জাল বিছিয়ে রেখেছে।
















