যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যেকার দীর্ঘদিনের উত্তেজনা এখন যে পর্যায়ে পৌঁছেছে, তাতে সহসা শান্তির সাদা পতাকা দেখার সম্ভাবনা খুব একটা নেই বললেই চলে। পাল্টাপাল্টি হামলা আর হুমকির মুখে দুই দেশই এখন মারমুখী অবস্থানে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ার চেয়ে অবনতি হওয়ার আশঙ্কাই এখন ১০০% বেশি। বিশেষ করে ওয়াশিংটন যখন ইরানের ওপর নতুন করে সর্বাত্মক অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করল, তখন থেকেই সংঘাতের মাত্রা এক নতুন ধাপে পৌঁছে গেছে। এই অবরোধ কেবল ইরানের ওপরই নয়, বরং দেশটির সাথে বাণিজ্য করা অন্য দেশগুলোর ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। ফলে বৈশ্বিক বাজার ও তেলের দামে এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে।
ওয়াশিংটনের প্রধান লক্ষ্য হলো ইরানকে একঘরে করে ফেলা এবং তাদের অর্থনৈতিকভাবে এতটাই পঙ্গু করে দেওয়া যেন তারা শেষ পর্যন্ত মাথা নত করে আলোচনার টেবিলে বসে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজে ইরানের বারবার হামলার ঘটনা হোয়াইট হাউসকে ক্ষুব্ধ করেছে। গত ফেব্রুয়ারি মাস থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে এই অঞ্চলে তাদের প্রভাব বাড়ানোর চেষ্টা করছে, যার ফলে গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ এখন কার্যত যুদ্ধের ময়দানে পরিণত হয়েছে। যদিও গত জুন মাসে দুই পক্ষ ৬০ দিনের একটি সমঝোতা স্মারকে (এমওইউ) সই করেছিল, কিন্তু সেই সময়সীমা কোনো ফল ছাড়াই শেষ হয়ে গেছে। এখন সংঘাত সপ্তম মাসে গড়িয়েছে এবং কোনো পক্ষই ১% ছাড় দিতেও রাজি নয়।
ওয়াশিংটনের মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের সিনিয়র ফেলো জেসন ক্যাম্পবেল মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের আসল কৌশল ঠিক কী, তা নিয়ে খোদ হোয়াইট হাউসের ভেতরেই অস্পষ্টতা রয়েছে। শুরুতে মার্কিন প্রশাসন ভেবেছিল সামরিক শক্তি আর ১০০% অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগ করলেই ইরান দ্রুত আত্মসমর্পণ করবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, ইরান তাদের সীমিত সামরিক সক্ষমতা দিয়েই যুক্তরাষ্ট্রকে কড়া জবাব দিচ্ছে। ক্যাম্পবেল বলছেন, “যুক্তরাষ্ট্র এখন হরমুজ প্রণালিতে ইরানের তেলবাহী জাহাজ বা কৌশলগত অবস্থানগুলোতে মাঝেমধ্যে হামলা চালিয়ে পরিস্থিতি নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতে চাইছে। তাদের আশা, নতুন নিষেধাজ্ঞায় ইরানের অর্থনীতি যখন ধসে পড়বে, তখন তারা দুর্বল অবস্থায় আলোচনার টেবিলে আসবে।” বর্তমানে তেলের বাজারে যাতে বড় কোনো বিপর্যয় না ঘটে, সেজন্য যুক্তরাষ্ট্র সীমিত আকারে জাহাজ চলাচলের সুযোগ দিচ্ছে, তবে সংঘাতের মূল সুর এখনো কাটেনি।
অন্যদিকে, লন্ডনের চ্যাথাম হাউসের গবেষক আনিসেহ বাসিরি তাবরিজির মতে, মার্কিন হামলার মুখে ইরান তাদের মূল নীতি থেকে এক চুলও নড়বে না। ইরান সরকার বর্তমানে তাদের অর্থনীতির ওপর আসা অতিরিক্ত চাপ সামলানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। দেশটির অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে এমনিতেই মুদ্রাস্ফীতি চরমে, তার ওপর নতুন এই অবরোধ সাধারণ মানুষের জীবনে নাভিশ্বাস তুলে দিচ্ছে। তবুও তেহরান মনে করে, চাপের মুখে নতি স্বীকার করা মানে হলো দীর্ঘমেয়াদে নিজেদের সার্বভৌমত্ব হারানো। তাই প্রতিটি মার্কিন হামলার বিপরীতে তারা আনুপাতিক হারে পাল্টা জবাব দেওয়ার কৌশল নিয়েছে। ইরান এখন চায় যুক্তরাষ্ট্র হয় আগের সমঝোতা চুক্তিতে ফিরে আসুক, অথবা তাদের ওপর থেকে অন্তত ৫০% নিষেধাজ্ঞা তুলে নিক। এর নিচে কোনো শর্তে তারা কথা বলতে আগ্রহী নয়।
যুক্তরাজ্যের সাবেক রাষ্ট্রদূত ও নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ নিকোলাস হপটন এই সংকট নিরসনে ভিন্ন এক পথ দেখছেন। তিনি মনে করেন, কেবল শক্তি প্রয়োগ করে ইরানকে দাবিয়ে রাখা সম্ভব নয়। কারণ ইরান জানে বিশ্ব অর্থনীতিতে তাদের অবস্থান কতটা গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে চীন ও রাশিয়ার মতো দেশগুলো যদি ইরানের সাথে বাণিজ্য চালিয়ে যায়, তবে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা খুব একটা ফলপ্রসূ হবে না। হপটন বলেন, “গত জুনের সমঝোতা স্মারকটি ছিল এই সংকট থেকে বের হওয়ার একটি মোক্ষম উপায়। ট্রাম্প যদি তখন আন্তরিক হতেন, তবে হয়তো আজ পরিস্থিতি ভিন্ন হতো। সেই চুক্তিতে ইরানের ওপর থেকে সব নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার একটি জাদুকরি প্রস্তাব ছিল।” তিনি মনে করেন, নিষেধাজ্ঞা তুলে নিলে ইরানের প্রভাবশালী ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) রাজনৈতিক প্রভাব ধীরে ধীরে কমে যেত এবং দেশটির সামাজিক চরিত্রে এক ধরনের উদার পরিবর্তন আসত।
বর্তমানে কুহেস্তাক ও সিরিকের মতো ইরানের সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলোতে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বাড়ছে। গত ২ সেপ্টেম্বর এক বিয়ের অনুষ্ঠানের কাছে হওয়া হামলায় ধ্বংসস্তূপের যে ছবি সামনে এসেছে, তা সাধারণ মানুষের মনে আতঙ্ক ছড়িয়ে দিয়েছে। এই ধরনের অমানবিক হামলার ফলে বিশ্বজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের ভাবমূর্তি সংকটের মুখে পড়ছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, যদি দ্রুত কোনো কূটনৈতিক সমাধান না আসে, তবে হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্ববাজারে সরবরাহ করা তেলের প্রায় ২০% থেকে ৩০% বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এতে করে প্রতি ব্যারেল তেলের দাম ১০০ ডলার ($১০০) ছাড়িয়ে যাওয়াও অস্বাভাবিক নয়, যা বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধস নামাতে পারে।
সব মিলিয়ে দেখা যাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয় পক্ষই এখন এক ধরণের ইগো বা অহমের লড়াইয়ে লিপ্ত। ওয়াশিংটন চাইছে ইরানকে পুরোপুরি নিঃস্ব করতে, আর তেহরান চাইছে তাদের প্রতিরোধের ক্ষমতা বিশ্বকে দেখাতে। এই বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিতে শান্তি চুক্তির সম্ভাবনা ১% এর নিচে নেমে এসেছে বলে অনেক কূটনৈতিক বিশ্লেষক মনে করছেন। যদি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়ন বা জাতিসংঘ দ্রুত মধ্যস্থতা না করে, তবে এই সংঘাত আরও কয়েক বছর স্থায়ী হতে পারে। আর এই অনিয়মিত যুদ্ধের বলি হচ্ছে সাধারণ মানুষ এবং বিশ্ব অর্থনীতি। আপাতত একটি অমীমাংসিত ও সংঘাতময় ভবিষ্যতের দিকেই এগিয়ে যাচ্ছে এই দুই চিরশত্রু দেশ।
















