কোটচাঁদপুরে শ্রীকৃষ্ণের জন্মাষ্টমী: সত্য ও ন্যায়ের পথে চলার অঙ্গীকারে মুখরিত সিদ্ধেশ্বরী কালী মন্দির

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

রফিক মন্ডল, কোটচাঁদপুর (ঝিনাইদহ)

ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুর আজ এক অপূর্ব সাজে সেজেছে। ভাদ্রের মেঘমুক্ত আকাশের নিচে ঢোল আর কাঁসরের আওয়াজে চারপাশ যেন এক অন্য জগতে রূপ নিয়েছে। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব শ্রীকৃষ্ণের শুভ জন্মাষ্টমী উপলক্ষে পুরো উপজেলায় বইছে আনন্দের ধারা। কোটচাঁদপুর কেন্দ্রীয় সিদ্ধেশ্বরী কালী মন্দির আজ কেবল একটি উপাসনালয় নয়, বরং পরিণত হয়েছে হাজার হাজার মানুষের মিলনমেলায়। সকাল থেকেই ভক্তদের পদচারণায় মন্দির প্রাঙ্গণ কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে ওঠে। সবার মুখে একটাই প্রার্থনা পৃথিবী থেকে সব কালিমা মুছে গিয়ে যেন সত্য, ন্যায় আর মানবতার জয় হয়।

শুক্রবার সকাল ১০টার দিকে সিদ্ধেশ্বরী কালী মন্দির থেকে বের হয় এক বিশাল ও বর্ণাঢ্য আনন্দ শোভাযাত্রা। এই শোভাযাত্রায় উপস্থিত ভক্তদের উৎসাহ দেখে মনে হচ্ছিল পুরো শহরের ১০০% মানুষ আজ রাস্তায় নেমে এসেছে। ঢাক-ঢোল, শঙ্খ আর উলুধ্বনিতে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে কোটচাঁদপুর শহরের প্রধান প্রধান সড়ক। ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা শ্রীকৃষ্ণ ও রাধার পোশাক পরে শোভাযাত্রায় অংশ নেয়, যা পথচারীদের নজর কাড়ে। ভক্তরা খোল-করতালের তালে তালে নেচে-গেয়ে কৃষ্ণের গুণগান করেন। আয়োজক কমিটির এক সদস্য জানান, এই শোভাযাত্রার জন্য তারা গত কয়েকদিন ধরে প্রস্তুতি নিয়েছেন এবং এবার প্রায় ৫,০০০ মানুষের সমাগম হয়েছে, যা গতবারের চেয়ে অন্তত ২০% বেশি।

শোভাযাত্রাটি শহরের চৌগাছা বাসস্ট্যান্ড হয়ে মেইন বাসস্ট্যান্ড এলাকা প্রদক্ষিণ করে পুনরায় মন্দির প্রাঙ্গণে এসে শেষ হয়। এরপর শুরু হয় আলোচনা সভা। কোটচাঁদপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মোঃ শামীম হোসাইন প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে অনুষ্ঠানের শোভা বাড়ান। তিনি তাঁর বক্তব্যে বলেন, “বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ। এখানে আমরা সবাই ভাই ভাই। শ্রীকৃষ্ণের দর্শন আমাদের শেখায় কীভাবে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে ন্যায়ের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হয়।” তিনি আরও জানান, উৎসবের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে ১০০% সতর্কতা অবলম্বন করা হয়েছে এবং কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা এড়াতে পর্যাপ্ত পুলিশ মোতায়েন ছিল।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন উপজেলা বিএনপির সভাপতি মোঃ আব্দুর রাজ্জাক এবং পৌর বিএনপির সভাপতি এস.কে.এম সালাহ উদ্দিন বুলবুল সিডল। রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের উপস্থিতি প্রমাণ করে যে, ধর্মীয় উৎসবগুলো এখন আর কোনো বিশেষ শ্রেণির নয়, বরং তা জাতীয় উৎসবে পরিণত হয়েছে। বক্তারা বলেন, শ্রীকৃষ্ণের বাঁশির সুর যেমন মানুষকে ভালোবাসায় টানে, তেমনি বর্তমান সমাজের হানাহানি বন্ধ করতে আমাদের একে অপরকে ভালোবাসতে হবে। তারা হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান কল্যাণ ফ্রন্টের সভাপতি পবিত্র কুমার দাস ও সাধারণ সম্পাদক শান্তি বিশ্বাসের সাথে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন এবং সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সার্বিক সহযোগিতার আশ্বাস দেন।

আয়োজক কমিটি সূত্রে জানা গেছে, এবারের জন্মাষ্টমী উৎসবের জন্য স্থানীয় ভক্তদের অনুদানে প্রায় ৬,৫০,০০০ টাকার (যা প্রায় ৫,৪০০ মার্কিন ডলারের সমান) একটি তহবিল গঠন করা হয়েছিল। এই অর্থ দিয়ে মন্দিরের আলোকসজ্জা, সাউন্ড সিস্টেম এবং আগত ভক্তদের জন্য উন্নত মানের প্রসাদের ব্যবস্থা করা হয়। কমিটির সভাপতি বাবু কানাই লাল সাহা জানান, অর্থের চেয়েও ভক্তদের শ্রম ও ভালোবাসা ছিল ১০০% নিখুঁত। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত কয়েক হাজার মানুষের জন্য খিচুড়ি প্রসাদের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। প্রসাদ বিতরণের সময় স্বেচ্ছাসেবকদের তদারকিতে কোনো বিশৃঙ্খলা হয়নি এবং সবাই সারিবদ্ধভাবে প্রসাদ গ্রহণ করেন।

শিক্ষক সুবাস কুমার রায় তাঁর আলোচনায় শ্রীকৃষ্ণের শৈশব থেকে শুরু করে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের শিক্ষাগুলো অত্যন্ত সহজ ভাষায় তুলে ধরেন। তিনি বলেন, সমাজে যখন অন্ধকারের রাজত্ব বেড়ে যায়, তখনই আলোর মশাল নিয়ে মহাবতারের আবির্ভাব ঘটে। বর্তমান যুগে শিক্ষার হার বাড়লেও মানবিকতার হার যেন কমে যাচ্ছে। তাই নতুন প্রজন্মকে শ্রীকৃষ্ণের প্রজ্ঞা আর মানবতার শিক্ষায় শিক্ষিত করতে হবে। আলোচনা সভা শেষে উপস্থিত ভক্তরা সমস্বরে দেশ ও জাতির কল্যাণ কামনায় বিশেষ মোনাজাতে অংশ নেন। তারা দোয়া করেন যেন বাংলাদেশের ১৮ কোটি মানুষের জীবনে শান্তি ও সমৃদ্ধি বজায় থাকে।

বিকেলের দিকে মন্দিরে ধর্মীয় সংগীত ও ভজন কীর্তনের আয়োজন করা হয়। স্থানীয় শিল্পীদের পাশাপাশি দূর-দূরান্ত থেকে আসা কীর্তনীয়া দল তাদের পরিবেশনার মাধ্যমে আধ্যাত্মিক পরিবেশ তৈরি করেন। ভক্তরা গভীর মনোযোগ দিয়ে সেই ভজন শোনেন এবং অনেকে আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়েন। কোটচাঁদপুর এলাকার সাধারণ মুসলিম ও অন্যান্য ধর্মের মানুষও রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে শোভাযাত্রার আনন্দ উপভোগ করেছেন, যা আমাদের দীর্ঘদিনের সহাবস্থানের পরিচয় দেয়। এটি কেবল একটি পূজা নয়, বরং সব ধর্মের মানুষের মাঝে এক চমৎকার সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করেছে।

সন্ধ্যার পর সিদ্ধেশ্বরী কালী মন্দিরে আরতির মাধ্যমে দিনের কর্মসূচির সমাপ্তি ঘটলেও উৎসবের রেশ থেকে যায় প্রতিটি মানুষের হৃদয়ে। মন্দির কমিটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, রাত ১২টা ১ মিনিটে শ্রীকৃষ্ণের জন্মতিথি স্মরণে বিশেষ পূজা ও হরিনাম সংকীর্তন অনুষ্ঠিত হবে। কোটচাঁদপুরের এই আয়োজন প্রমাণ করে যে, সত্য, ন্যায় আর মানবতার জয় সবসময়ই অনিবার্য। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এই উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত যেন সারাবছর অটুট থাকে, সেই প্রত্যাশাই আজ সবার চোখেমুখে ফুটে উঠেছে। দিনভর এই উৎসবের আনন্দ আর প্রশাসনের সুশৃঙ্খল তদারকি কোটচাঁদপুরবাসীকে এক সুন্দর অভিজ্ঞতা উপহার দিয়েছে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ