সমাজ থেকে সব অপশক্তি দূর করার অঙ্গীকার আইনমন্ত্রীর: শৈলকুপায় জন্মাষ্টমীর বর্ণাঢ্য আয়োজন

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

ঝিনাইদহের শৈলকুপায় আজ এক উৎসবমুখর দিন পার করলেন আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। শ্রীকৃষ্ণের শুভ জন্মাষ্টমী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তিনি পরিষ্কার বার্তা দিয়েছেন যে, সমাজ থেকে সব ধরনের অশুভ ও অপশক্তিকে উপড়ে ফেলতে হবে। মন্ত্রী আজ সকাল থেকে শৈলকুপার বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে সাধারণ মানুষের সাথে সরাসরি কথা বলেন। তিনি সাফ জানিয়ে দেন, বাংলাদেশে প্রতিটি ধর্মের মানুষ ১০০% স্বাধীনভাবে তাদের ধর্মীয় উৎসব পালন করবে, এখানে কারো ওপর কোনো হস্তক্ষেপ সহ্য করা হবে না। অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে সবাইকে হাতে হাত রেখে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।

সকাল থেকেই শৈলকুপা শহর যেন সাজ সাজ রবে মেতে ওঠে। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রধান এই উৎসবে যোগ দিতে উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম থেকে ভক্তরা সমবেত হতে থাকেন। শৈলকুপা রামগোপাল মন্দির চত্বরে আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে আইনমন্ত্রী বলেন, “আমাদের দেশটা সব ধর্মের মানুষের। এখানে হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ বা খ্রিস্টান বলে কোনো ভেদাভেদ নেই। শ্রীকৃষ্ণের শিক্ষা ছিল অন্যায় আর অবিচারের বিরুদ্ধে লড়াই করা। বর্তমান সমাজেও সেই শিক্ষা আমাদের কাজে লাগাতে হবে। আমরা চাই এমন এক সমাজ যেখানে কোনো অপশক্তি মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারবে না।” তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, সরকারের এই শান্তি ও উন্নয়ন রক্ষার সংগ্রামে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা সবসময় সরকারের পাশে থাকবেন।

মন্ত্রী কেবল আলোচনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না, দিনভর তিনি শৈলকুপার নানা উন্নয়নমূলক ও সামাজিক কাজে অংশ নেন। দিনের শুরুতে সকাল ৮টায় তিনি উপজেলা পরিষদের পুকুরে মাছের পোনা অবমুক্ত করেন। এ সময় মৎস্য কর্মকর্তাদের সাথে আলাপকালে তিনি বলেন, দেশে মাছের উৎপাদন গত কয়েক বছরে প্রায় ২৫% বৃদ্ধি পেয়েছে। তিনি স্থানীয়দের উদ্দেশে বলেন, শুধু সরকারি উদ্যোগ যথেষ্ট নয়, আমিষের চাহিদা মেটাতে বিত্তবানদেরও এগিয়ে আসতে হবে। এরপর সকাল সাড়ে ৮টার দিকে তিনি উপজেলা চত্বরে আয়োজিত বৃক্ষমেলা পরিদর্শন করেন। মেলায় বিভিন্ন স্টল ঘুরে দেখে তিনি সন্তোষ প্রকাশ করেন এবং জানান যে পরিবেশ রক্ষা করতে হলে আমাদের দেশের অন্তত ২৫% বনভূমি থাকা প্রয়োজন।

আইনমন্ত্রীর এই সফরের অন্যতম বিশেষ আকর্ষণ ছিল দুস্থ মানুষের মাঝে ত্রাণ বিতরণ। সকাল ৯টায় শৈলকুপা পাইলট হাই স্কুল মাঠে সংযুক্ত আরব আমিরাতের অর্থায়নে এই ত্রাণ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সংযুক্ত আরব আমিরাতের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূত রাশেদ আল জাবির। আয়োজকরা জানান, এই কর্মসূচির আওতায় প্রায় ৫০০টি দুস্থ পরিবারের মাঝে খাদ্য ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী বিতরণ করা হয়েছে, যার বাজারমূল্য প্রায় ১২,০০০ মার্কিন ডলার (প্রায় ১৪,৪০,০০০ টাকা)। মন্ত্রী নিজে উপস্থিত থেকে অসহায় মানুষের হাতে এই সাহায্য তুলে দেন এবং বিদেশি বন্ধুদের এই মানবিক উদ্যোগকে স্বাগত জানান।

দুপুরের দিকে শুরু হয় জন্মাষ্টমীর মূল আকর্ষণ বর্ণাঢ্য আনন্দ শোভাযাত্রা। মন্দিরের আলোচনা সভা শেষে মন্ত্রী নিজেই ভক্তদের সাথে নিয়ে এই মিছিলে অংশ নেন। বর্ণিল সাজে সজ্জিত ট্রাক, ঘোড়ার গাড়ি আর ঢাক-ঢোলের শব্দে শৈলকুপার প্রধান সড়কগুলো মুখরিত হয়ে ওঠে। শোভাযাত্রাটি শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট প্রদক্ষিণ করে। রাস্তার দুই পাশে দাঁড়িয়ে থাকা কয়েক হাজার মানুষ হাত নেড়ে এই শোভাযাত্রাকে অভিনন্দন জানান। অনেক ছোট শিশু শ্রীকৃষ্ণের পোশাকে সেজে শোভাযাত্রার সৌন্দর্য আরও বাড়িয়ে দেয়। এ সময় মন্ত্রী স্থানীয় জনগণের সাথে কুশল বিনিময় করেন এবং প্রসাদ বিতরণ কর্মসূচিতে অংশ নেন।

অনুষ্ঠানে স্থানীয় প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন। ঝিনাইদহের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ নোমান হোসেন এবং পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আশিস বিন হাছান পুরো আয়োজনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিরলস কাজ করেন। একটি বিশেষ দিক ছিল রাজনৈতিক সম্প্রীতি; অনুষ্ঠানে জেলা পরিষদের প্রশাসক ও জেলা বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট এম এ মজিদ উপস্থিত থেকে মন্ত্রীর সাথে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। স্থানীয়রা বলছেন, বড় বড় রাজনৈতিক নেতার একমঞ্চে আসা চুয়াডাঙ্গা ও ঝিনাইদহ অঞ্চলের দীর্ঘদিনের ভাতৃত্ববোধের পরিচয় দেয়। আয়োজক কমিটি জানায়, অনুষ্ঠানে আগত ভক্তদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশের পাশাপাশি স্বেচ্ছাসেবক দলের প্রায় ১০০% সদস্য মোতায়েন ছিল।

আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান তাঁর বক্তব্যে আরও বলেন, “ধর্ম যার যার, কিন্তু উৎসব সবার। এই যে আজ হাজার হাজার মানুষ এক হয়েছে, এটাই আমাদের বাংলাদেশের প্রকৃত চেহারা।” তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, বর্তমান সরকার ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর উন্নয়নে বাজেটে বরাদ্দ বাড়িয়েছে। স্থানীয় মন্দির কমিটির এক সদস্য জানান, মন্দিরের সংস্কার কাজের জন্য সরকার থেকে সম্প্রতি প্রায় ২,০০,০০০ টাকা অনুদান পাওয়া গেছে। মন্ত্রী এসব অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করারও নির্দেশ দেন।

দিনের শেষ ভাগে মন্ত্রী স্থানীয় সুধী সমাজের সাথে এক মতবিনিময় সভায় মিলিত হন। সেখানে তিনি এলাকার রাস্তাঘাট উন্নয়ন ও শিক্ষা ব্যবস্থার আধুনিকায়নের প্রতিশ্রুতি দেন। তিনি বলেন, উন্নয়নের সুফল যেন সাধারণ মানুষের কাছে ১০০% পৌঁছায়, তা নিশ্চিত করাই তাঁর সরকারের লক্ষ্য। সন্ধ্যায় যখন জন্মাষ্টমীর আরতি শুরু হয়, তখন মন্ত্রী শৈলকুপা ত্যাগ করেন। তবে তাঁর এই সফর স্থানীয় মানুষের মনে এক নতুন উদ্দীপনা সৃষ্টি করেছে। সাধারণ মানুষ মনে করছেন, মন্ত্রীর এমন সরাসরি অংশগ্রহণ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিকে আরও মজবুত করবে এবং সমাজ থেকে অপরাধ ও অপশক্তি দূর করতে সাহস জোগাবে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ