ঝিনাইদহের শৈলকুপায় একটি যাত্রীবাহী বাসে আকস্মিক অভিযান চালিয়ে বিশাল এক মাদকের চালান জব্দ করেছে র্যাব-৬। বুধবার বিকেলে উপজেলার গাড়াগঞ্জ বাসস্ট্যান্ড এলাকায় এই শ্বাসরুদ্ধকর অভিযান চালানো হয়। বাসের মালামাল রাখার বিশেষ জায়গা বা ব্যাংকার থেকে পরিত্যক্ত অবস্থায় ৫২২ গ্রাম উন্নত মানের হেরোইন উদ্ধার করেছে র্যাব সদস্যরা। যার বাজার মূল্য কয়েক লক্ষ টাকা হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে অভিযানের সময় অত্যন্ত ধূর্ত পাচারকারীরা সুকৌশলে পালিয়ে যাওয়ায় এখন পর্যন্ত কাউকে সরাসরি গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। এই ঘটনাটি এলাকায় বেশ চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে।
র্যাব-৬ ঝিনাইদহ ক্যাম্পের সদস্যরা গোপন সূত্রে একটি নির্ভরযোগ্য সংবাদ পান যে, কুষ্টিয়া থেকে খুলনার দিকে যাওয়া একটি যাত্রীবাহী বাসে করে হেরোইনের একটি বড় বড় চালান পাচার করা হচ্ছে। এই সংবাদের ভিত্তিতে র্যাবের একটি চৌকস দল দ্রুত শৈলকুপার গাড়াগঞ্জ বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অবস্থান নেয়। সেখানে তারা মহাসড়কে বিশেষ চেকপোস্ট বসিয়ে কুষ্টিয়া-খুলনা রুটে চলাচলকারী বিভিন্ন যানবাহনে তল্লাশি শুরু করে। বিকেল আনুমানিক ৪টার দিকে যখন কুষ্টিয়া হতে খুলনাগামী ‘রুপসা পরিবহন’ নামক একটি যাত্রীবাহী বাস সেখানে পৌঁছায়, তখন র্যাব সদস্যরা সেটি থামিয়ে দেন এবং ভেতরে ও বাইরের বিভিন্ন অংশে তল্লাশি চালাতে থাকেন।
তল্লাশির একপর্যায়ে র্যাব সদস্যরা বাসের মালামাল রাখার জায়গা বা ব্যাংকারের দিকে নজর দেন। সেখানে সাধারণ যাত্রীদের বিভিন্ন ব্যাগ ও বস্তার ভিড়ে একটি সন্দেহজনক কাপড়ের ব্যাগ পড়ে থাকতে দেখা যায়। র্যাব সদস্যরা সেই ব্যাগটি খুলতেই বেরিয়ে আসে অভিনব কায়দায় রাখা ৫২২ গ্রাম ওজনের হেরোইনের প্যাকেটগুলো। বাসের ড্রাইভার এবং হেল্পারকে দীর্ঘক্ষণ জিজ্ঞাসাবাদ করা হলেও তারা এই ব্যাগের প্রকৃত মালিক সম্পর্কে কোনো সঠিক তথ্য দিতে পারেননি। ধারণা করা হচ্ছে, চেকপোস্টের খবর পেয়ে বা বাসের ভেতরে র্যাব ওঠার সাথে সাথে কোনো মাদক পাচারকারী ব্যাগটি পরিত্যক্ত অবস্থায় ফেলে রেখে সাধারণ যাত্রীদের সাথে মিশে চম্পট দিয়েছে।
ঝিনাইদহ র্যাব ক্যাম্পের (সিপিসি-২) অধিনায়ক স্কোয়াড্রন লিডার ইমামীম মুবীন সরকার সুমন রাতে ইমেইলের মাধ্যমে সাংবাদিকদের এই অভিযানের বিস্তারিত তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, মাদক ব্যবসায়ীরা এখন আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে ফাঁকি দিতে নিত্য নতুন কৌশল অবলম্বন করছে। তারা মনে করছে যাত্রীবাহী বাসের মালামাল রাখার জায়গায় মাদক লুকিয়ে রাখলে হয়তো সেটি কারো নজরে আসবে না। কিন্তু আমাদের গোয়েন্দা তৎপরতা ১০০% কার্যকর ছিল বলেই এই বড় চালানটি ধরা সম্ভব হয়েছে। ৫২২ গ্রামের এই পরিমাণ হেরোইন উদ্ধার করা আমাদের জন্য একটি বড় সাফল্য। মাদক নির্মূলে আমাদের এই ধরণের ঝটিকা অভিযান ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে।
উদ্ধার করা এই ৫২২ গ্রাম হেরোইনের স্থানীয় বাজার মূল্য অনেক বেশি। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের বিশেষজ্ঞরা জানান, হেরোইন আমাদের দেশের যুবসমাজের জন্য এক ভয়াবহ অভিশাপ এবং এই মরণ নেশার বিস্তার ঠেকাতে না পারলে সমাজের নৈতিক অবক্ষয় রোধ করা প্রায় অসম্ভব। স্থানীয় বাসিন্দারা মহাসড়কে র্যাবের এই সাহসী অভিযানকে সাধুবাদ জানিয়েছেন। এলাকাবাসীর মতে, কুষ্টিয়া-ঝিনাইদহ-খুলনা মহাসড়কটি মাদক পাচারের একটি প্রধান রুট হিসেবে ব্যবহার করছে অসাধু চক্র। এই পথে নিয়মিত কঠোর নজরদারি থাকলে মাদকের সরবরাহ কমিয়ে আনা সম্ভব হবে বলে তারা মনে করেন।
জব্দকৃত মাদকদ্রব্য হেরোইনগুলো উদ্ধার করার পর সেগুলোকে আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শৈলকুপা থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে। এই ঘটনায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে একটি নিয়মিত মামলা দায়ের করা হয়েছে। যদিও অভিযানে কাউকে হাতেনাতে ধরা যায়নি, তবে র্যাব জানিয়েছে তারা ওই বাসের যাত্রীদের তালিকা এবং বাসের স্টাফদের দেওয়া তথ্যগুলো যাচাই করে দেখছে। বাসের মালামাল বুকিং দেওয়ার সময় যদি সঠিক জাতীয় পরিচয়পত্র বা ফোন নম্বর নেওয়ার নিয়ম কার্যকর করা হতো, তবে এমন অপরাধীদের ধরা আরও সহজ হতো বলে অনেকে মনে করছেন।
ঝিনাইদহ ও এর পার্শ্ববর্তী জেলাগুলোতে মাদকের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ বা শূন্য সহনশীলতা নীতি গ্রহণ করেছে জেলা প্রশাসন ও পুলিশ। ৫২২ গ্রাম হেরোইন উদ্ধার কেবল একটি সাধারণ ঘটনা নয়, এটি মাদক পাচারকারীদের জন্য একটি সতর্ক বার্তা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে সাধারণ যাত্রীদের প্রতি অনুরোধ জানানো হয়েছে, ভ্রমণের সময় যদি কেউ পাশের সিটে বা বাসের ব্যাংকারে কোনো মালিকবিহীন সন্দেহজনক ব্যাগ দেখে, তবে যেন দ্রুত কর্তৃপক্ষকে জানায়। সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এই ধরণের বিষাক্ত মাদক থেকে সমাজকে রক্ষা করা সম্ভব। বর্তমানে পুলিশ ও র্যাবের গোয়েন্দা শাখা পাচারকারী চক্রের মূল হোতাদের শনাক্ত করতে ছায়া তদন্ত শুরু করেছে।
















