ঝিনাইদহে এলএলবি পরীক্ষার অস্বাভাবিক ফি বৃদ্ধির প্রতিবাদ: বর্ধিত ফি প্রত্যাহারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের মানববন্ধন

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

ঝিনাইদহে এলএলবি প্রথম পর্ব পরীক্ষার ফি অস্বাভাবিক হারে বাড়ানো হয়েছে। এই বর্ধিত ফি প্রত্যাহার এবং ফি পুনর্নির্ধারণের দাবিতে রাজপথে নেমেছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। বুধবার বিকেলে ঝিনাইদহ শহরের ব্যস্ততম পায়রা চত্বরে এক বিশাল মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করা হয়। শহীদ জিয়াউর রহমান আইন মহাবিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীরা এই প্রতিবাদ কর্মসূচির আয়োজন করেন। মানববন্ধনে কয়েকশ শিক্ষার্থী ব্যানার-ফেস্টুন হাতে অংশ নিয়ে তাদের কষ্টের কথা তুলে ধরেন এবং দ্রুত এই সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের জন্য শিক্ষা প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।

শিক্ষার্থীদের প্রধান অভিযোগ হলো, গত কয়েক বছর ধরে পরীক্ষার ফি যে হারে বাড়ছে তা সাধারণ কোনো পরিবারের পক্ষে মেনে নেওয়া সম্ভব নয়। বক্তারা সুনির্দিষ্ট তথ্য দিয়ে জানান, ২০২৪ সালে এলএলবি প্রথম পর্বের পরীক্ষার ফি ছিল মাত্র ৩০০ টাকা। এরপর ২০২৫ সালে সেটি বাড়িয়ে করা হয়েছিল ৭০০ টাকা। কিন্তু ২০২৬ সালের পরীক্ষার জন্য ফি নির্ধারণ করা হয়েছে ১,২০০ টাকা। অর্থাৎ মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে পরীক্ষার ফি বেড়েছে ৩০০% বা তিন গুণেরও বেশি। একজন শিক্ষার্থীর জন্য হঠাৎ করে এভাবে ৫০০ টাকা থেকে এক লাফে ১,২০০ টাকা ফি পরিশোধ করা অত্যন্ত কষ্টসাধ্য এবং অযৌক্তিক হয়ে পড়েছে। এই অস্বাভাবিক ফি বৃদ্ধিতে অনেক দরিদ্র শিক্ষার্থীর পরীক্ষায় বসা নিয়েই এখন বড় ধরণের অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।

মানববন্ধনে বক্তব্য দেওয়া শিক্ষার্থীরা জানান, আইন বিষয়ে যারা পড়াশোনা করেন তাদের একটি বড় অংশই বিভিন্ন সরকারি বা বেসরকারি চাকরির প্রত্যাশী অথবা বেকার। অনেকেই আবার স্বল্প আয়ের বা নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তান। তাদের নিজেদের দৈনন্দিন খরচ চালানোর পাশাপাশি পড়াশোনার বিশাল ব্যয় মেটাতে এমনিতেই সারাক্ষণ হিমশিম খেতে হয়। বিশেষ করে আইন বিষয়ের বইপত্রের দাম অনেক বেশি। এছাড়া যাতায়াত খরচ এবং কলেজের অন্যান্য শিক্ষাসংশ্লিষ্ট খরচ মেটানোর পর এই বাড়তি পরীক্ষার ফি দেওয়া তাদের ওপর মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘার মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক শিক্ষার্থীর মাসিক হাতখরচের একটি বড় অংশ যদি কেবল পরীক্ষার ফি দিতেই চলে যায়, তবে তারা কীভাবে মাস পার করবেন—সেই প্রশ্নই এখন সবার মুখে মুখে।

মানববন্ধনে শিক্ষার্থীদের পক্ষে শারমিন সুলতানা, প্রান্ত বিশ্বাস, এরশাদ আলী, শান্তা আক্তার, ছাব্বির আহমেদ তুষার, শাহরিয়ার হোসাইন ও আসাদুজ্জামান আসাদ বক্তব্য রাখেন। এছাড়াও সাবেক শিক্ষার্থী রুবিনা খাতুন ও কলেজের সহকারী ইমরান হোসেন শিক্ষার্থীদের এই যৌক্তিক দাবির সাথে একাত্মতা প্রকাশ করে বক্তব্য দেন। বক্তারা বলেন, উচ্চশিক্ষা অর্জনের পথকে যদি এভাবে ব্যয়বহুল করে তোলা হয়, তবে সাধারণ ঘরের মেধাবী শিক্ষার্থীরা মাঝপথে পড়াশোনা ছেড়ে দিতে বাধ্য হবে। শিক্ষা যেখানে মানুষের মৌলিক অধিকার, সেখানে পরীক্ষার ফি কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেওয়াটা শিক্ষার প্রসারকে সরাসরি বাধাগ্রস্ত করার শামিল। তারা এই বর্ধিত ফি-কে ‘শিক্ষার্থী বিরোধী’ ও ‘অমানবিক’ পদক্ষেপ হিসেবে অভিহিত করেন।

শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে কর্তৃপক্ষের কাছে বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট দাবি পেশ করা হয়েছে। তারা অবিলম্বে এই ১,২০০ টাকার বর্ধিত ফি প্রত্যাহার করার জোর দাবি জানান। সেই সাথে পরীক্ষার ফি এমন একটি সহনীয় পর্যায়ে নিয়ে আসার অনুরোধ করেন যা সব স্তরের শিক্ষার্থীর জন্য দেওয়া সম্ভব হয়। শিক্ষার্থীরা স্পষ্ট করে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, যদি অতি দ্রুত ফি পুনর্নির্ধারণ করা না হয় তবে তারা আগামীতে আরও কঠোর আন্দোলন গড়ে তুলবেন। তারা সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের কাছে এই বিষয়টি মানবিক দিক থেকে বিবেচনা করার জন্য বিনীত অনুরোধ জানান। তাদের মতে, পড়াশোনার সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রাখতে হলে শিক্ষার খরচ সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে রাখতে হবে।

ঝিনাইদহের পায়রা চত্বরে যখন এই মানববন্ধন চলছিল, তখন সাধারণ পথচারী ও অভিভাবকরাও শিক্ষার্থীদের দাবির প্রতি সংহতি প্রকাশ করেন। অনেক অভিভাবক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বাজারে বর্তমানে জিনিসপত্রের দাম যে হারে বাড়ছে তাতে সন্তানদের পড়াশোনা চালানোই এখন যুদ্ধের মতো কঠিন হয়ে পড়েছে। এর মধ্যে যদি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন ফি এভাবে লাফে লাফে বাড়তে থাকে তবে গরিব মানুষের পক্ষে সন্তানদের উচ্চ শিক্ষিত করার স্বপ্ন দেখা বন্ধ করে দিতে হবে। শিক্ষার্থীরা জানান, তারা কেবল নিজেদের পকেটের কথা ভেবে নয়, বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের আইন শিক্ষার্থীদের অধিকার রক্ষায় রাজপথে নেমেছেন। তারা চান এমন একটি বৈষম্যহীন ব্যবস্থা যেখানে টাকার অভাবে কোনো মেধাবী ছাত্রের ফরম ফিলাপ বন্ধ হবে না।

বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা মানববন্ধনের শেষে বলেন, তারা রাজপথে সময় নষ্ট না করে পড়ার টেবিলে ফিরে যেতে চান। কিন্তু পরিস্থিতির চাপে তারা আজ রাস্তায় দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করতে বাধ্য হয়েছেন। যেখানে আগে ৩০০ টাকায় পরীক্ষা দেওয়া যেত, সেখানে এখন কেন ১,২০০ টাকা দিতে হবে তার কোনো সঠিক ব্যাখ্যা শিক্ষার্থীরা পাননি। ১,২০০ টাকা ফি দেওয়া অনেক মেধাবী ও পরিশ্রমী ছাত্রের জন্য পাহাড়সম বোঝা। তাই এই বর্ধিত ফি-র হিসাব বদলে দিয়ে আবারও একটি যৌক্তিক ও সহনীয় ফি নির্ধারণের জন্য তারা কর্তৃপক্ষের কাছে শেষবারের মতো আহ্বান জানিয়েছেন। তারা আশা করেন, প্রশাসন শিক্ষার্থীদের এই চোখের পানি বুঝবে এবং দ্রুত একটি ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নেবে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ