মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি এখন চরম উত্তপ্ত। মঙ্গলবার রাতে জর্ডান, ইরাক, কুয়েত ও বাহরাইনে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোতে একের পর এক ভয়াবহ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইরান। ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) সরাসরি এই হামলার দায় স্বীকার করেছে। মূলত দক্ষিণ ইরানে মার্কিন বিমান হামলার কঠোর প্রতিশোধ নিতেই তেহরান এই বড় পদক্ষেপ নিয়েছে। এই ঘটনার পর দুই পরাশক্তির মধ্যে সরাসরি যুদ্ধের আশঙ্কা প্রায় ১০০% বেড়ে গেছে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা। পরিস্থিতি এতটাই থমথমে যে, যেকোনো সময় পুরো অঞ্চলে বড় ধরনের সংঘাত ছড়িয়ে পড়তে পারে।
ইরানের সামরিক বাহিনী দাবি করেছে, জর্ডানের প্রিন্স হাসান বিমানঘাঁটিতে মার্কিন বাহিনীর শক্তিশালী আরকিউ-৪ এবং এমকিউ-৯ ড্রোনের হ্যাঙ্গারগুলো লক্ষ্য করে তারা ‘ভারী’ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে। তাদের দাবি অনুযায়ী, এই হামলায় কয়েকটি দামী ড্রোন ধ্বংস হওয়ার পাশাপাশি বেশ কয়েকজন মার্কিন কারিগরি কর্মী নিহত হয়েছেন। আইআরজিসি এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, তাদের নিখুঁত নিশানায় মার্কিন সামরিক অবকাঠামোর বেশ কিছু অংশে দাউ দাউ করে আগুন ধরে গেছে। তবে ওয়াশিংটন এবং জর্ডান এই ক্ষয়ক্ষতির খবর নাকচ করে দিয়েছে। জর্ডান জানিয়েছে, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা প্রায় ৮০% ক্ষেপণাস্ত্র মাঝপথেই ধ্বংস করতে পেরেছে।
ড্রোন ঘাঁটি ছাড়াও জর্ডানের ‘ক্যাম্প তিতিন’-এ থাকা মার্কিন মেরিন সেনাদের ব্যারাকে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইরান। আইআরজিসি দাবি করেছে, সেখানে অনেক মার্কিন সেনা হতাহত হয়েছেন এবং শত্রুপক্ষের কয়েকটি ‘অ্যাটক হেলিকপ্টার’ পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। ইরান বলছে, হরমোজগান প্রদেশের সিরিকে একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে মার্কিন বর্বরোচিত হামলার জবাব দিতেই তারা এই আক্রমণ করেছে। ওই বিয়ের অনুষ্ঠানে হামলায় অন্তত ১ জন শিশুসহ ৪ জন নিরপরাধ মানুষ প্রাণ হারিয়েছিলেন। নিজেদের নাগরিকদের মৃত্যুর বদলা নিতেই ইরান এখন ‘অপারেশন থান্ডার’ শুরু করেছে।
উত্তর ইরাকের এরবিল প্রদেশেও একই সময়ে মার্কিন স্থাপনায় সমন্বিত ড্রোন হামলা চালানো হয়। আইআরজিসি জানিয়েছে, সেখানকার একটি মেরামত কেন্দ্র এবং নজরদারি বেলুনের গাইডেন্স সিস্টেম গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। হামলায় মার্কিন ঘাঁটির বিশাল জ্বালানি ট্যাংকে আগুন ধরে যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে। ইরান দাবি করছে, সেখানেও বেশ কিছু মার্কিন সেনা নিহত হয়েছে। যদিও একটি মার্কিন সূত্র আল-জাজিরাকে জানিয়েছে, তাদের সেনারা আগেভাগেই সতর্ক থাকায় বড় কোনো প্রাণহানি ঘটেনি। তবে কারিগরি সরঞ্জামের অন্তত ২০% থেকে ৩০% ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
কুয়েত ও বাহরাইনেও হামলার খবর পাওয়া গেছে। কুয়েত সেনাবাহিনী জানিয়েছে, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বেশ কিছু ‘শত্রু ড্রোন’ সফলভাবে ভূপাতিত করেছে। অন্যদিকে বাহরাইনের শেখ ঈসা বিমানঘাঁটিতে মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে এক ঝাঁক ড্রোন ছুড়েছে তেহরান। বাহরাইনের এই ঘাঁটিটি মার্কিনদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এখান থেকেই তাদের নজরদারি বিমান ও হেলিকপ্টারগুলো পরিচালিত হয়। ইরানের দাবি, তাদের এই হামলাটি ছিল পূর্বপরিকল্পিত সামরিক অভিযানের ২৯তম ধাপ। হামলার পর ওই অঞ্চলে মোতায়েন করা মার্কিন সেনাদের মধ্যে ব্যাপক আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
এর আগে মঙ্গলবার দিনের শুরুতে দক্ষিণ ইরানের বন্দর আব্বাস, কেশম দ্বীপ ও চাবাহারসহ আটটি প্রধান এলাকায় ব্যাপক বিমান হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। গত জুলাই মাসের পর এটিই ছিল দুই দেশের মধ্যে সবচেয়ে বড় সরাসরি সংঘাত। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তেহরানকে আগে থেকেই ‘কঠোর’ আঘাত হানার হুমকি দিয়েছিলেন। ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ইরান যদি আবারও পাল্টা আঘাত করে, তবে তাদের ওপর আরও ১০০০$ কোটি ডলার মূল্যের সামরিক সরঞ্জাম দিয়ে আরও ভয়াবহ হামলা চালানো হবে। ট্রাম্পের এই কড়া বার্তার পরই ইরান মধ্যপ্রাচ্যের সবকটি মার্কিন ঘাঁটিকে টার্গেট করে হামলা চালায়।
বর্তমানে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন ও ইরানি বাহিনীর পাল্টাপাল্টি অবস্থানের কারণে তেলের বাজারেও অস্থিরতা শুরু হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম এক রাতেই প্রায় ৫% থেকে ৮% পর্যন্ত বেড়ে গেছে। বিশ্বনেতারা দুই পক্ষকেই শান্ত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তবে পরিস্থিতি বলছে অন্য কথা। কোনো পক্ষই একে অপরকে ছাড় দিতে রাজি নয়। এই অস্থিরতা যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে বিশ্ব অর্থনীতিতে কয়েকশ কোটি ডলারের লোকসান হতে পারে। আপাতত পুরো বিশ্ব তাকিয়ে আছে হোয়াইট হাউস এবং তেহরানের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে, কারণ ছোট্ট একটি ভুল থেকেই শুরু হতে পারে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ।
















