ঝিনাইদহের শৈলকুপায় মাদক নির্মূলে বড় ধরনের সাফল্য পেয়েছে স্থানীয় থানা পুলিশ। গত ৩১ আগস্ট ২০২৬ তারিখে পুলিশ দিন ও রাতভর এক বিশেষ অভিযান চালিয়ে ১০ জন মাদকসেবীকে হাতেনাতে গ্রেফতার করে। এই অভিযানে পুলিশের তৎপরতা ছিল চোখে পড়ার মতো। গ্রেফতারের পর পুলিশ দেরি না করে আসামিদের আদালতে পাঠালে বিজ্ঞ আদালত তাদের অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের আদেশ দেন। মাদকের মরণছোবল থেকে সমাজকে রক্ষা করতে শৈলকুপা থানা পুলিশ এখন শতভাগ সক্রিয় অবস্থানে রয়েছে।
পুলিশ জানায়, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে শৈলকুপার বিভিন্ন এলাকায় এই মাদকবিরোধী অভিযান চালানো হয়। অভিযানে গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তিদের ২০১৮ সালের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের ৩৬(৫) ধারা মোতাবেক বিজ্ঞ আদালতে সোপর্দ করে পুলিশ। আদালত প্রতিটি আসামির জবানবন্দি ও সাক্ষ্য-প্রমাণ শেষে তাদের সাজা ঘোষণা করেন। এই রায়ের ফলে এলাকায় মাদকসেবী ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে, আর স্বস্তি ফিরেছে সাধারণ মানুষের মনে। পুলিশের এই অভিযানে মাদকাসক্তদের পাশাপাশি তাদের পরিবারের কাছেও একটি কড়া বার্তা পৌঁছে গেছে।
দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের মধ্যে জামাল মোল্যা (৩৭) ও মোঃ শামীম (৩৮) উভয়কেই ৬ মাস করে কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। জামাল মোল্যাকে ১৫০০ টাকা এবং শামীমকে ২০০০ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। জরিমানার টাকা দিতে না পারলে তাদের আরও ১৫ দিন অতিরিক্ত জেল খাটতে হবে। এছাড়া মাগুরা জেলা থেকে আসা সজিবকে (২৬) ২ মাসের জেল ও ৫০০ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, বাইরের জেলা থেকে এসে শৈলকুপায় মাদক সেবন বা কেনাবেচা করলে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। এই কঠোর অবস্থান মাদক নিয়ন্ত্রণে অন্তত ৫০% বেশি কার্যকর হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সাজাপ্রাপ্তদের তালিকায় আরও রয়েছেন মধুদহ গ্রামের জনী কুমার সরকার, যাকে আদালত ৬ মাসের কারাদণ্ড ও ১৫০০ টাকা জরিমানা করেছেন। কুষ্টিয়া থেকে আসা হাসানকে (৩০) ৪ মাসের জেল ও ২০০০ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। ঝিনাইদহ সদরের মোঃ সুমনকে (৩৩) আদালত ৭ মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড ও ২-০০ টাকা (মূল নথি অনুযায়ী) জরিমানা করেছেন, যা অনাদায়ে তাকে ২০৫ দিন অতিরিক্ত জেল খাটতে হতে পারে। এছাড়া ১৯ বছর বয়সী তরুণ প্রান্ত দাসকে ৫ মাসের জেল ও ১০০০ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। অল্প বয়সে মাদকের প্রতি এই ঝুঁকে পড়া সমাজের জন্য বড় একটি উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অভিযানে আরও তিনজনকে সাজা দেওয়া হয়েছে। তাদের মধ্যে মোঃ সফিকুল ইসলাম ৪ মাসের জেল ও ৫০০ টাকা জরিমানা পেয়েছেন। অনিন্দ্য আনজুস তুর্যকে (৩১) ৩ মাসের জেল ও ২০০০ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। সবশেষে বয়োজ্যেষ্ঠ মাদকসেবী মোঃ উজ্জল জোয়াদ্দারকে (৫০) আদালত ৬ মাসের কারাদণ্ড ও ২০০০ টাকা জরিমানা করেছেন। জরিমানার অর্থ অনাদায়ে প্রত্যেকের জন্যই অতিরিক্ত বিনাশ্রম কারাদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়েছে। পুলিশ বলছে, বয়সের কোনো ভেদাভেদ নেই; অপরাধী যেই হোক না কেন, তাকে আইনের আওতায় আসতেই হবে।
শৈলকুপা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোঃ হুমায়ূন কবির মোল্লা এই অভিযানের বিষয়ে সরাসরি কথা বলেছেন। তিনি জানান, “মাদক ও অপরাধমুক্ত জেলা গড়াই আমাদের প্রধান লক্ষ্য। আমরা এলাকায় মাদকের সরবরাহ শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে চাই। আমাদের এই বিশেষ অভিযান আগামী দিনগুলোতেও একইভাবে অব্যাহত থাকবে।” তিনি আরও যোগ করেন যে, কোনো মাদক ব্যবসায়ীর সঙ্গে পুলিশের আপস করার সুযোগ নেই। শৈলকুপার শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সাধারণ জনগণকে পুলিশের পাশে দাঁড়ানোর এবং তথ্য দিয়ে সাহায্য করার আহ্বান জানান তিনি।
বর্তমান সময়ে মাদকের প্রকোপ বেড়ে যাওয়ায় অপরাধের হারও বেড়ে চলেছিল। তবে পুলিশের এই সময়োপযোগী পদক্ষেপে স্থানীয়রা খুশি। অনেক অভিভাবক মনে করছেন, এমন নিয়মিত অভিযান চললে তাদের সন্তানরা বিপথে যাওয়ার হাত থেকে রক্ষা পাবে। মাদকবিরোধী এই সাঁড়াশি অভিযান কেবল আইনগত ব্যবস্থা নয়, বরং এটি একটি সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির অংশ। শৈলকুপা থানা পুলিশের এই সাহসী ভূমিকা অন্যান্য এলাকার জন্যও উদাহরণ হয়ে থাকবে। মাদকের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে পুলিশের এই শতভাগ প্রচেষ্টা সফল হলে সমাজ থেকে অপরাধের ছায়া ধীরে ধীরে কেটে যাবে।
















