স্বজনহীন মরদেহের শেষ ঠিকানায় স্বজন হলেন পুলিশ: শৈলকুপায় অনন্য এক মানবিকতার গল্প

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

দুনিয়া বড় বিচিত্র। এখানে কেউ বিশাল অট্টালিকায় প্রিয়জনদের ঘেরাটোপে বিদায় নেন, আবার কেউ শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন একদম নিঃসঙ্গ অবস্থায়। ঝিনাইদহের শৈলকুপায় গত কয়েকদিন ধরে এমনই এক হৃদয়বিদারক ঘটনার সাক্ষী হয়েছে এলাকাবাসী। এক অজ্ঞাত ব্যক্তি মারা গেলেন যার পরিচয় জানার জন্য পুলিশ আপ্রাণ চেষ্টা করল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তার কোনো রক্তের সম্পর্কের আত্মীয়ের দেখা মেলেনি। যখন মৃতদেহের পাশে দাঁড়ানোর মতো একজন মানুষও ছিল না, তখন শেষ বিদায়ে স্বজন হয়ে পাশে দাঁড়াল শৈলকুপা থানা পুলিশ। পরিবারের অনুপস্থিতিতে পুলিশের এই মানবিক ভূমিকা বর্তমানে পুরো জেলায় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে এবং মানুষের মনে জায়গা করে নিয়েছে।

ঘটনাটি শুরু হয় গত শুক্রবার দিবাগত রাত আনুমানিক ১টার দিকে। শৈলকুপা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ওই অজ্ঞাত ব্যক্তি মারা যান। চিকিৎসকদের মতে, লোকটির বয়স ছিল আনুমানিক ৫৫ থেকে ৬০ বছর। মৃত্যুর আগে প্রায় ১৫ দিন তিনি হাসপাতালের বেডে যন্ত্রণায় কাতরালেও কেউ তার খবর নিতে আসেনি। পুলিশ খবর পাওয়ার পর থেকেই তার পরিচয় শনাক্তে ১০০% আন্তরিকতা নিয়ে কাজ শুরু করে। তারা মৃতদেহের ছবি তুলে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয় এবং আশেপাশের অন্তত ৩০ থেকে ৪০টি থানায় বার্তা পাঠায়। কিন্তু ৪৮ ঘণ্টা পার হয়ে গেলেও কোনো পরিবার বা স্বজন সেই মরদেহ দাবি করতে এগিয়ে আসেনি।

সাধারণত পরিচয়হীন মৃতদেহ দাফনের জন্য আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের সহায়তা নেওয়া হয়, কিন্তু এবার শৈলকুপা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোঃ হুমায়ূন কবির মোল্লা একটু অন্যভাবে ভাবলেন। তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন, এই মানুষটির শেষ বিদায় যেন কোনো অবহেলায় না হয়। তার এই মানবিক চিন্তায় পূর্ণ সমর্থন দেন তদন্ত ওসি শাকিল আহমেদ। এরপরই শুরু হয় দাফন-কাফনের আনুষ্ঠানিক প্রস্তুতি। পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়, একজন মানুষের শেষ বিদায় সম্মানজনক হওয়াটা তার মৌলিক অধিকার। সেই অধিকার নিশ্চিত করতেই পুলিশ প্রশাসন স্বজনের ভূমিকা পালন করার সিদ্ধান্ত নেয়।

দাফনের প্রয়োজনীয় খরচ মেটাতে শৈলকুপা থানার পুলিশ সদস্যরা নিজেদের ব্যক্তিগত তহবিল থেকে প্রায় ৭০০০/- থেকে ১০০০০/- টাকা সংগ্রহ করেন। এসআই তরিকুল ইসলাম এবং কনস্টেবল মামুন হোসেন সরাসরি মাঠে নেমে সব কাজ তদারকি করেন। বাজার থেকে নতুন কাফনের কাপড় কেনা, আতর ও গোলাপজল জোগাড় করা এবং গোরস্থানে জায়গা ঠিক করার কাজগুলো তারা অত্যন্ত যত্ন সহকারে সম্পন্ন করেন।এ সময় অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে পুলিশের সহযোগিতা করে লাশটি হাসপাতাল থেকে গোরস্থানে পৌঁছে দেন অ্যাম্বুলেন্স মালিক রবি । তাদের এমন তৎপরতা দেখে হাসপাতালের সাধারণ রোগী ও স্থানীয় ব্যবসায়ীরাও বিষ্মিত হন।

অবশেষে শনিবার বিকালে শৈলকুপা পৌর এলাকার ঐতিহ্যবাহী শাহী মসজিদ গোরস্থানে ধর্মীয় রীতি মেনে মরদেহটি দাফন করা হয়। যখন কবরে মাটি দেওয়া হচ্ছিল, তখন সেখানে কোনো রক্তের সম্পর্কের ভাই বা সন্তান ছিল না ঠিকই, কিন্তু খাকি পোশাক পরা কয়েকজন পুলিশ সদস্য ঠিকই আপনজনের মতো দাঁড়িয়ে মোনাজাত করছিলেন। জানাজায় স্থানীয় প্রায় শতাধিক সাধারণ মানুষ অংশ নেন। উপস্থিত জনতা বলেন, তারা আগে কখনো পুলিশকে এত কাছ থেকে মানুষের জন্য এভাবে কাজ করতে দেখেননি। এটি পুলিশের প্রতি সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের ধারণা পাল্টে দিতে সাহায্য করবে।

বর্তমানে ডিজিটাল যুগে মানুষের সাথে মানুষের দূরত্ব বাড়ছে, কিন্তু শৈলকুপা থানা পুলিশ দেখাল যে হৃদয়ের টান এখনো মরে যায়নি। জরিপে দেখা গেছে, সাধারণ মানুষের চোখে পুলিশের ভাবমূর্তি ইতিবাচক করার ক্ষেত্রে এমন ছোট ছোট মানবিক কাজগুলো ৮০% বেশি কার্যকর হয়। এলাকার ১০ জন মানুষের মধ্যে ৯ জনই পুলিশের এই উদ্যোগের ভূয়সী প্রশংসা করছেন। তারা বলছেন, আইনশৃঙ্খলার রক্ষার পাশাপাশি পুলিশ যদি এমন মানবিক কাজে এগিয়ে আসে, তবে সমাজের অস্থিরতা অনেক কমে যাবে। পুলিশ যে কেবল লাঠি আর হ্যান্ডকাফ নিয়ে ঘোরে না, তাদেরও যে একটা মমতাময়ী মন আছে শৈলকুপার এই ঘটনা তারই জলজ্যান্ত প্রমাণ।

সবশেষে অফিসার ইনচার্জ মোঃ হুমায়ূন কবির মোল্লা বলেন, আমরা আইনের মানুষ হলেও দিনশেষে আমরাও রক্ত-মাংসের মানুষ। আমাদের হৃদয়েও মায়া-মমতা আছে। বেওয়ারিশ ওই ব্যক্তির শেষ ঠিকানা সুন্দরভাবে নিশ্চিত করতে পেরে আমাদের মনে একটা আত্মতৃপ্তি কাজ করছে। আমরা কেবল দায়িত্ব পালন করিনি, বরং একজন মানুষের প্রতি অন্য মানুষের যে চিরন্তন ঋণ থাকে, তা শোধ করার চেষ্টা করেছি। পুলিশের এই মানবিক দৃষ্টান্ত শৈলকুপার ইতিহাসে এক অনন্য উদাহরণ হয়ে থাকবে এবং মানুষের মনে দীর্ঘকাল অমলিন থাকবে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ